‘মিডটার্মের ২ সাবজেক্টেই ফেল’ ট্রাম্প বাহিনী

বারবার একই ঘটনা ঘটলে তা আর কাকতালীয় থাকে না। স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দল যে উভয়কক্ষ ধরে রাখতে পারে না— তা অনুমেয়ই বটে। ‘ট্রাম্প ২.০’ জামানার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলও তেমনই হলো। তাই অবাকও হইনি। রীতিমতো ‘দুই বিষয়ের’ পরীক্ষাতেই ‘এ+’ মিস করেছেন ট্রাম্প। না পেরেছেন উচ্চকক্ষ সিনেটে, না নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে। আর নির্বাচনে ‘এ+’ প্লাস মিস মানে ফেল করা। মাঝে অন্য কোনো গ্রেড নেই।

ট্রাম্প অবশ্য এবার মনে করালেন জর্জ বুশকে। ২০ বছর আগে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন বুশ। সেবারও উভয়কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিল রিপাবলিকানরা। এরকম কিন্তু খুব কমই হয়। একটা না একটা কক্ষে রানিং প্রেসিডেন্টের দল ভালো করে বা মেজরিটি ধরে রাখে। এবার ‘দুই সাবজেক্টেই অকৃতকার্য’ ট্রাম্পের দল, দুই দশকে প্রথমবার।

ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আপনি। সেমিস্টারের মাঝে মিডটার্ম পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারেননি। তখন আপনাকে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসতে হয় ফাইনাল টার্মে কত মার্কস পেলে, কীভাবে পড়াশোনা করলে গ্রেড শিট সম্মানজনক সিজিপিএ নিয়ে আসবে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মিডটার্ম পরীক্ষা অনেকটা সেরকমই। তবে, ফাইনাল টার্মে তিনি তো পরীক্ষায় বসছেন না। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাতি মার্কার প্রার্থীর জন্য অপেক্ষা করছে একটু বাড়তি চাপ-সমীকরণ।

এবারের মধ্যবর্তী ভোটে মার্কিন আইনসভার দুই কক্ষেই জয়ের কেতন উড়িয়েছে ডেমোক্র্যাট শিবির। ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতির দল আসন কম পাবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি নিয়ে যারা একটু হলেও খোঁজ রাখেন তাদের কাছে এটি এখন স্বাভাবিক। এখন কী ভাবছেন ট্রাম্প?

এই নির্বাচনে বাহ্যিক দিক থেকে নীল শিবিরের (ডেমোক্র্যাট) প্রতি ভোটারদের উপচে পড়া ভালোবাসা দেখা গেলেও, বাস্তবতা হচ্ছে ট্রাম্প ও তার দলের প্রতি ক্ষোভের প্রতিফলন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, সেখানকার জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় এবং মার্কিন মুলুক পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা—  সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণের মতো সেই ক্ষোভ হয়ত ব্যালটে প্রকাশ করেছেন তারা।  

ভোটের ফলাফল এখনও আসছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর পদে কারা আসীন হচ্ছেন, জানা যাচ্ছে একেকটি নাম। কিছু জায়গায় তো ডেমোক্র্যাটরা কয়েক যুগের আক্ষেপের অবসান ঘটিয়েছে। কিছু রাজ্যে আবার শতাব্দীর অপেক্ষা ফুরিয়েছে।

যাই হোক, ট্রাম্পের কথাতেই ফিরে আসি। হারের পর তার উদ্ভট কিছু আত্মপক্ষ সমর্থন বেশ চোখে লেগেছে। এই যেমন বলেছেন— ব্যালটে তার নাম থাকলে অন্যরকম হতো ভোটের ফলাফল। তাহলে ট্রাম্প কি নিজেকে ফিল্মের সেই সুপারস্টারদের মতো মনে করেন, যার ছবি পোস্টারে থাকলে দর্শকরা চোখ বন্ধ করে টিকিট কেটে শো হাউসফুল করে প্রযোজকের প্রজেক্ট ব্লকবাস্টার করার সামর্থ্য রাখেন? ট্রাম্প কি নিজেকে রিপাবলিকান শিবিরের ‘টম ক্রুজ’ ভাবেন?

আপাতত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তার চিরাচরিত পাগলামি চলতেই থাকবে। আর সেটি যদি গতানুগতিক ধাঁচে চলে, তাহলে ডেমোক্র্যাটদের বিরোধীতা করার জন্যই বিরোধীতা করবেন উনি, এতোটুকু নিশ্চিত। তার অতীত কার্যক্রম যতটুকু দেখেছি সেরকমই মনে হচ্ছে।

ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ট্রাম্পের যে কয়েকটি অজুহাত সামনে এসেছে সেগুলোকেও অপরিণত মনোভাবের বহিঃপ্রকাশই বলা যায়। একান্ত নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি নিয়ে গণমাধ্যমের দিকে আঙুল তোলা— বেশ দৃষ্টিকটু লেগেছে। সেই গণমাধ্যমটি ট্রাম্পের এক সময়ের প্রাণপ্রিয় ফক্স নিউজ।

বাহানা যাই হোক, বাস্তবতা হলো ভোটের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। রাজনৈতিক শিষ্টাচারের জায়গা থেকে অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের শুভেচ্ছা-অভিনন্দনও জানিয়েছে ট্রাম্প। ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও দলের বিপর্যয় যে সহজভাবে নিতে পারছেন না, সে তো ভেটো হুঁশিয়ারিতেই দৃশ্যমান। অবশ্য হুঁশিয়ারির চেয়ে একে হুমকিই বেশি মনে হয়েছে।

কয়েকদিন বাদেই যে বাস্তবতা দেখা যাবে, তা হলো পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ হারানোয় ট্রাম্পের জন্য তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আইন পাস, বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখন ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করতে হতে পারে রিপাবলিকানদের। সামনের এই দোটানা কতটা-কীভাবে সমান্তরালে আনবেন ট্রাম্প, তা হয়ত সময়ই বলে দেবে। 

আপাতত উভয়কক্ষের হিসাবে ২-০ গোলে পিছিয়ে আছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। দ্বিতীয়ার্ধে খেলা কি ঘুরবে? ২০২৮-এ তো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দুই বছর বাদে ‘গাধা’ ফিরতে চাইবে হোয়াইট হাউসে। এই মধ্যবর্তী নির্বাচন ‘হাতি’র জন্য অ্যালার্মই বটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *