মার্কিন কংগ্রেসে ইতিহাস গড়লেন আফগান বংশোদ্ভূত আইশা ওয়াহাব

ক্যালেনিফোর্নিয়ার এক বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মার্কিন ক্যাপিটল হিলে প্রথম আফগান-আমেরিকান হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদে প্রবেশের ইতিহাস গড়েছেন আইশা ওয়াহাব। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ওয়াহাব ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ উপনির্বাচনে তারই দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী মেলিসা হার্নান্দেজকে পরাজিত করেন। তার প্রচারণার বিরুদ্ধে কোটি কোটি ডলারের বাইরে থেকে আসা অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও তিনি এই জয় ছিনিয়ে আনেন। খবর ডনের।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। তাঁর এই বিজয় ক্যাপিটল হিলে আফগান-আমেরিকান ও মুসলিমদের জন্য এক নতুন কণ্ঠস্বর এনে দিয়েছে, যা একই সঙ্গে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরেছে। 

আইশা ওয়াহাবের এই বিজয় ব্যাপকভাবে প্রত্যাশিতই ছিল। গত জুনের প্রাইমারি নির্বাচনে তিনি হার্নান্দেজের চেয়ে ২৫ শতাংশেরও বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন। তবে মূল লড়াইয়ে ব্যবধান বেশ কমে আসে। বেশিরভাগ ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, ওয়াহাব প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন।  প্রতিযোগিতাটি বেশ নাটকীয় মোড় নেয় যখন বাইরের বেশ কিছু গোষ্ঠী এই নির্বাচনে লাখ লাখ ডলার ঢালতে শুরু করে।

ক্যাম্পেইন ফাইন্যান্স রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো হার্নান্দেজের সমর্থনে এবং আইশা ওয়াহাবের বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপনে আনুমানিক ৬৩ থেকে ৬৪ লাখ ডলার ব্যয় করে। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলেই ওয়াহাবের যে নিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল, তা একটি নাটকীয় ও কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়। 

আইশা ওয়াহাব সাবেক আইনপ্রণেতা এরিক সোয়ালওয়েলের মেয়াদের অবশিষ্ট মাসগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন। যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগের মুখে সোয়ালওয়েল এপ্রিলে পদত্যাগ করেছিলেন, যদিও তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সোয়ালওয়েলের খালি থাকা মেয়াদ পূরণের জন্যই এই বিশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদের জন্য আগামী নভেম্বরে ওয়াহাব এবং হার্নান্দেজ আবার মুখোমুখি নির্বাচনে অবতীর্ণ হবেন। 

নিউ ইয়র্কের কুইন্সে জন্ম নেওয়া আইশা ওয়াহাবের বাবা-মা ছিলেন আফগান শরণার্থী, যারা ১৯৮০-র দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। ছোটবেলায় তার বাবা খুন হন, যে হত্যাকাণ্ডের ক্লু আজও উদ্ধার হয়নি। এর কিছুদিন পরই তার মা মারা গেলে ওয়াহাব ও তার বোন দত্তক পরিবারে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রিমন্টের এক আফগান দম্পতি দুই বোনকে দত্তক নেন এবং সেখানেই আইশা ওয়াহাব বেড়ে ওঠেন।

এক বিবৃতিতে আইশা ওয়াহাব বলেন, ‘আমাকে গড়ে তোলা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য আমি লড়াই করব। দত্তক পরিবারে বেড়ে ওঠা থেকে কংগ্রেস পর্যন্ত—আমার এই যাত্রা নির্দেশ করে যে আমেরিকান ড্রীম সত্যি হওয়া কতটা সম্ভব।’

জন এফ কেনেডি হাই স্কুল এবং ওহলোন কলেজে পড়াশোনার পর ওয়াহাব ২০১০ সালে সান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সমাজকর্মে ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ২০২২ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হন, যা ছিল দেশটির কোনো রাজ্য সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম ও আফগান-আমেরিকানের রেকর্ড। আর এবার কংগ্রেসে তাঁর এই প্রবেশ আফগান-আমেরিকানদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করল।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচক ছিলেন আইশা ওয়াহাব। তিনি গাজায় ইসরায়েলের এই হামলাকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তিনি ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সাহায্য বন্ধের দাবীকেও সমর্থন করেন, যেখানে তিনি মানবিক সহায়তা এবং অস্ত্র সহায়তার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *