বিশ্বকাপে ভাঙছে বহু বছরের ঐতিহ্য

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উত্তেজনা আর নানা ঐতিহ্যের সমন্বয়। ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় দুই দলের খেলোয়াড়দের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ দেশের সংগীত গাওয়ার দৃশ্যও বিশ্বকাপের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। বহু বছরের প্রচলিত নিয়ম থেকে সরে এসে জাতীয় সংগীতের সময় নতুন প্রোটোকল চালু করতে যাচ্ছে ফিফা।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগের মতো খেলোয়াড়রা এক লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যালারি বা মূল স্ট্যান্ডের দিকে মুখ করে জাতীয় সংগীত গাইবেন না। বরং দুই দলের পুরো স্কোয়াডকে সেন্টার সার্কেলের চারপাশে গোলাকৃতিতে অবস্থান করতে দেখা যাবে। মাঠে থাকা শুরুর একাদশের পাশাপাশি বদলি বেঞ্চের খেলোয়াড়রাও এই আনুষ্ঠানিকতার অংশ হবেন।

ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় সংগীতের সময় মাঠের কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরেই সাজানো হবে পুরো আয়োজন। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়, দর্শক এবং সম্প্রচার— তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এতদিন জাতীয় সংগীতের সময় কেবল মাঠে নামা খেলোয়াড়দেরই দেখা যেত। তবে নতুন ব্যবস্থায় ম্যাচ ডে স্কোয়াডের সব সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফিফার মতে, একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব শুধু প্রথম একাদশ নয়, পুরো দলই করে। সেই ভাবনাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নতুন প্রোটোকলে।

২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে প্রি-ম্যাচ অনুষ্ঠানেও আনা হচ্ছে বেশ কিছু পরিবর্তন। জাতীয় পতাকার বিশেষ প্রদর্শনী, আধুনিক ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা, নতুন প্লেয়ার এন্ট্রি সিস্টেম এবং দর্শকদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য বিশেষ আয়োজন রাখা হচ্ছে।

স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের পাশাপাশি টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ দেখা কোটি কোটি মানুষের জন্য আরও আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করাই এর লক্ষ্য।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে দর্শকবান্ধব ও বর্ণাঢ্য আসরে পরিণত করতে চায় ফিফা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই জাতীয় সংগীতের সময় ‘৩৬০ ডিগ্রি টিম ফরমেশন’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ফিফা বিশ্বকাপ যত বড় হচ্ছে, আমরা খেলা উপভোগ করার অভিজ্ঞতায় নতুনত্ব আনছি। জাতীয় সংগীতের সময় সব খেলোয়াড় ও রেফারিদের সেন্টার সার্কেলে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করানো ঐক্য, গর্ব ও আবেগের একটি মুহূর্ত সৃষ্টি করবে, যা সত্যিকার অর্থে দলগুলোর এবং সবার জন্য হবে। ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিটি খেলোয়াড় ও প্রতিটি সমর্থকের জন্য। আর ম্যাচ পূর্ব এই নতুন আয়োজন সেই বিষয়টিকেই প্রতিফলিত করে।’

এদিকে, বিশ্বকাপের নতুন এই নিয়ম নিয়ে ইতোমধ্যে ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, এটি জাতীয় সংগীতের সময় দলগত ঐক্য ও আবেগকে আরও শক্তভাবে তুলে ধরবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য হারিয়ে যাওয়ায় বিশ্বকাপের পরিচিত আবহে পরিবর্তন আসবে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য এই টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮টি দল। ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে হবে ১০৪। ফলে মাঠের খেলার পাশাপাশি আয়োজন ও উপস্থাপনাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব।

সবকিছু ঠিক থাকলে, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই প্রথমবারের মতো দর্শকরা জাতীয় সংগীতের সময় নতুন এই গোলাকার অবস্থানের দৃশ্য দেখতে পাবেন। আর এর মধ্য দিয়েই ফুটবল বিশ্বকাপের আরেকটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *