সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ৬০ দিনের দীর্ঘ আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পর থেকে দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান, আর তারাই হতে যাচ্ছে এই অনুষ্ঠানের আয়োজক।
বিশ্বের ‘শান্তির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত জেনেভা বরাবরই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতা, জাতিসংঘ ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতি ও উপযুক্ত গোপনীয় পরিবেশের কারণে এই শহরটি শান্তি চুক্তির জন্য একটি আদর্শ স্থান।
ইতিহাসের পাতায় জেনেভায় স্বাক্ষরিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিগুলোর বিবরণ :
১. জেনেভা কনভেনশন (১৮৬৪ ও ১৯৪৯)
১৮৬৪ সালের ২২ আগস্ট যুদ্ধক্ষেত্রে অসুস্থ ও আহত সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করতে প্রথম জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। সুইস ব্যবসায়ী হেনরি ডুনান্টের উদ্যোগে এবং ১৮৫৯ সালের সলফেরিনোর যুদ্ধের পর এটি গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ৬৩টি দেশ এই নিয়মগুলোকে আরও প্রসারিত করে ৪টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে রূপ দেয়, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রধান ভিত্তি।
চারটি প্রধান চুক্তি
প্রথম কনভেনশন : যুদ্ধক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর আহত, অসুস্থ ও ধর্মীয় কর্মীদের সুরক্ষার পাশাপাশি অধিকৃত অঞ্চলের জনগণের মানবাধিকার সুরক্ষিত করে।
দ্বিতীয় কনভেনশন : সমুদ্রে সশস্ত্র বাহিনীর আহত, অসুস্থ ও জাহাজডুবিতে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের সুরক্ষার পাশাপাশি হাসপাতাল, জাহাজ ও নৌ-চিকিৎসা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
তৃতীয় কনভেনশন : সংঘাত বন্ধ হওয়ার পর যুদ্ধবন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর নীতি প্রতিষ্ঠা করে।
চতুর্থ কনভেনশন : দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত বা দখলদারিত্বের পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের সম্পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করে।
২. জেনেভা চুক্তি (১৯৫৪)
প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের (১৯৪৬-১৯৫৪) সংঘাত নিরসনের জন্য এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৫৪ সালের ২০-২১ জুলাই কম্বোডিয়া, লাওস, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও ভিয়েতনামের প্রতিনিধিরা এটি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে ইন্দোচীনে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। তবে চুক্তি অনুযায়ী সাময়িকভাবে ভিয়েতনামকে ১৭তম সমান্তরাল রেখায় উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং ১৯৫৬ সালে একটি পুনর্মিলন নির্বাচনের আহ্বান জানানো হয়।
৩. ইসরায়েল-সিরিয়া সেনা প্রত্যাহার চুক্তি (১৯৭৪)
১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯৭৪ সালের ৩১শে মে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়।
এটি সরাসরি কোনো শান্তি চুক্তি না হলেও এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে একটি পৃথকীকরণ (বাফার) অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়, সেনা প্রত্যাহার করা হয় ও যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। শান্তি বজায় রাখতে সেখানে জাতিসংঘের বিচ্ছিন্নকরণ পর্যবেক্ষণ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।
৪. মিশর-ইসরায়েল চুক্তি (১৯৭৫)
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের মধ্যস্থতায় ১৯৭৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জেনেভায় মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘সিনাই ২ চুক্তি’ নামেও পরিচিত।
ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের পর টেকসই শান্তির লক্ষ্যে এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি করা হয়। এর অধীনে ইসরায়েল সিনাইয়ের মিতলা ও গিদি গিরিপথ এবং আবু রুডেইস ও রাস সুদারের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়। বিনিময়ে মিশর ইসরায়েলি অসামরিক পণ্যবাহী জাহাজের জন্য সুয়েজ খাল খুলে দিতে রাজি হয়।
৫. জেনেভা চুক্তি (১৯৮৮)
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৮৮ সালের ১৪ এপ্রিল আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও জামিনদার হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির ফলেই আফগানিস্তান থেকে দীর্ঘদিনের সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার করা হয় ও যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়।
৬. জেনেভা চুক্তি (১৯৯১)
ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৯১ সালের নভেম্বরে ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া এবং প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ‘ভ্যান্স পরিকল্পনা’ নামেও পরিচিত।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভ্যান্সের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির ফলে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করা এবং ক্রোয়েশিয়া থেকে যুগোস্লাভ পিপলস আর্মি (জেএনএ) প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
৭. জেনেভা চুক্তি (২০০৩)
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জেনেভা ইনিশিয়েটিভ’ নামে পরিচিত এই চুক্তিটি ছিল ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সংঘাত অবসানের জন্য একটি বেসরকারি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের খসড়া পরিকল্পনা। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।