বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রবণতা এল নিনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)।
মার্কিন বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’-তে পরিণত হতে পারে। খবর বিবিসির।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর ওপর এই এল নিনোর প্রভাব পড়লে ২০২৭ সালে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড গড়তে পারে বিশ্ব। এর ফলে আবহাওয়া, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা দিতে পারে।
এনওএএ জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে, যা এল নিনো ঘোষণার জন্য নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরের বায়ুপ্রবাহেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে শুধু সমুদ্র নয়, পুরো বায়ুমণ্ডলই এখন এল নিনোর প্রভাবে সাড়া দিচ্ছে।
এল নিনোর শক্তি নির্ধারণ করা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে তার ওপর। যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায় তাহলে শক্তিশালী এল নিনো এবং যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায় তাহলে অত্যন্ত শক্তিশালী বা সুপার এল নিনো বলা হয়ে থাকে।
এনওএএ’র জুন মাসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে ৬৩ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার, যা ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে বড় এল নিনোগুলোর কাতারে স্থান পেতে পারে।
এর আগে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮, ২০১৫-১৬ সালে।
যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ বলেন, বর্তমান এল নিনো এমন সময়ে এসেছে যখন পৃথিবী ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ।
তার মতে, ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে এবং তা সহজেই শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণতার সীমা অতিক্রম করতে পারে।
আফ্রিকাভিত্তিক জলবায়ু সংগঠন পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেন, এল নিনো শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়, লাখো মানুষের জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত। এর অর্থ হতে পারে বৃষ্টির অভাব, ফসলহানি, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সংকট।
বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর সংখ্যা বা শক্তি বাড়াচ্ছে কি না। তবে তারা একমত যে, উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবী এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র ও বিপজ্জনক করে তুলছে।
ফলে আগামী দুই বছরে বিশ্বজুড়ে চরম তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।