ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে প্রস্তুত হলান্ড-ওডেগার্ডরা

ফুটবলপ্রেমীদের মনে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের সেই জাদুকরী রাতের স্মৃতি এখনো তাজা। বিশ্বকাপের দাবিদার ব্রাজিলের রবার্তো কার্লোস, রিভালদো, রোনালদোদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী একাদশকে ম্যাচের শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল নরওয়ে।

সেই ঐতিহাসিক রূপকথার পর হারিয়ে যায় নরওয়ে। এরপর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ফুটবলে নেমে এসেছিল প্রায় তিন দশকের অন্ধকার। অবশেষে দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপের মুলমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে।

কোচ স্টেল সলবাকেনের রণকৌশল এবং মার্টিন ওডেগার্ড ও আর্লিং হালান্ডের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের ওপর ভর করে নর্ডিক অঞ্চলের এই ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’ এবার উত্তর আমেরিকার মঞ্চে ইতিহাস নতুন করে লিখতে প্রস্তুত।

শেষ থেকে শুরুর গল্পে কোচ স্টেল সলবাকেন

নরওয়ে ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে আনার নায়ক যিনি, তিনি নিজে খেলোয়াড় হিসেবে নরওয়ের শেষ বিশ্বকাপ দলের সদস্য ছিলেন। জাতীয় দলের জার্সিতে ৫৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা সলবাকেন ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে তিনবার মাঠে নেমেছিলেন।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ২০০২ সালে হামারকামেরেতেনে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর কোলন, উলভারহ্যাম্পটন ও এফসি কোপেনহেগেনে সফল সময় পার করেন তিনি। অবশেষে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নরওয়ের প্রধান কোচের হট সিটে বসেন সলবাকেন।

১৯৯৮ সালে মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে যে যাত্রার ইতি দেখেছিলেন, ২০২৬ সালে ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সেখান থেকেই নরওয়েজিয়ান ফুটবলের নতুন এক মহাকাব্যিক অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন তিনি।

বাছাইপর্বে অপরাজেয় নরওয়ে

২০১৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে মাত্র চারটি দল সবগুলো ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। নরওয়ে তাদের মধ্যে একটি। ইউরোপীয় অঞ্চলের ‘গ্রুপ আই’-এ সলবাকেনের শিষ্যরা ৮ ম্যাচের আটটিতেই জয় তুলে নেয়। পুরো ইউরোপ মহাদেশ থেকে শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়া মাত্র নবম দল হিসেবে এই গৌরব অর্জন করে তারা।

মলদোভাকে ৫-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে বাছাইপর্বের অভিযান শুরু করার পর ইসরায়েল, ইতালি ও এস্তোনিয়ার বিরুদ্ধেও জয়ের ধারা বজায় রাখে তারা। গ্রুপের দ্বিতীয় ভাগে মলদোভাকে ১১-০ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের যৌথ-সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়ে নর্ডিক অঞ্চলের এই দলটি। সর্বশেষ সান সিরোতে ইতালির বিপক্ষে ৪-১ গোলের স্মরণীয় জয় দিয়ে নরওয়ে বাছাইপর্বের সমাপ্তি টানে।

২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের গ্রুপ ও ম্যাচ সূচি

উত্তর আমেরিকার মূল মঞ্চে ‘গ্রুপ ডি’-তে নরওয়েকে লড়তে হবে ইউরোপীয় ও আফ্রিকান পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে। ১৬ জুন বোস্টন স্টেডিয়ামে এশিয়ার দেশ ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে নরওয়ে। ২২ জুন নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আফ্রিকার দেশ সেনেগালের বিপক্ষে খেলবে দ্বিতীয় ম্যাচ। এরপর ২৬ জুন বোস্টন স্টেডিয়াম সাবেক চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে আর্লিং হলান্ডরা।

বিশ্বকাপের দল ঘোষণায় অনন্য

১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পাওয়ার এই ক্ষণটিকে রাজকীয় রূপ দিয়েছে দেশটি। বিশ্বকাপের জন্য নরওয়ের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন স্বয়ং দেশটির রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ড! আগে থেকে রেকর্ড করা এক বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ফুটবলারদের নাম ঘোষণা করেন তিনি।

পজিশনভিত্তিক ডেপথ অ্যানালাইসিস

স্টেল সলবাকেন এবার উত্তর আমেরিকার জন্য নরওয়ের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও তারকাবহুল স্কোয়াড সাজিয়েছেন। গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ হাস্কজোল্ড হাইলান্ডই থাকছেন প্রধান ভরসা। তবে ব্যাক-আপ হিসেবে সেলভিক ও তরুণ টাংভিকের অন্তর্ভুক্তি গোলকিপিং বিভাগকে ব্যাক-আপ গভীরতা দিয়েছে।

ব্রেন্টফোর্ডের ক্রিস্টোফার আয়ের এবং লিও অস্টিগার্ডের সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটি নরওয়ের রক্ষণভাগকে বেশ জমাট করেছে। এছাড়া উইং-ব্যাকে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের অ্যাসিস্টের রাজা জুলিয়ান রিয়ারসনের গতি ও ওভারল্যাপ করার ক্ষমতা ডিফেন্সের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নরওয়ের মাঝমাঠের প্রধান চালিকাশক্তি হলেন আর্সেনালের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। তার সৃষ্টিশীল পাসিং, ভিশন এবং খেলা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার ওপর নরওয়ের পুরো আক্রমণভাগের সাফল্য নির্ভর করছে। তাকে সাহায্য করবেন সান্ডার বার্গ ও ফ্রেডরিক আরসনেসের মতো পরিশ্রমী মিডফিল্ডাররা।

নরওয়ের আক্রমণভাগের মুল কারিগড় ম্যানচেস্টার সিটির ‘গোল মেশিন’ খ্যাত আর্লিং হলান্ড। বক্সের মধ্যে প্রতিপক্ষের জন্য কতটা বিপজ্জনক তিনি, ইতোমধ্যে বিশ্ব ফুটবলে সেটি জানান দিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে আতলেতিকো মাদ্রিদের গোলমেশিন আলেকজান্ডার সরলথ এবং লাইপজিগের গতিময় উইঙ্গার আন্তোনিও নুসার অন্তর্ভুক্তি নরওয়ের আক্রমণকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছে।

স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা

হলান্ডের বক্সে পজিশনিং ও ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং প্রতিপক্ষের যেকোনো ডিফেন্সের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। সেই সঙ্গে মাঝমাঠ থেকে ওডেগার্ডের নিখুঁত থ্রু-পাস ও ফ্রি-কিক এবং রিয়ারসন ও নুসার উইংয়ের গতি হলান্ডকে গোল করার অজস্র সুযোগ তৈরি করে দেবে।

তবে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এই স্কোয়াডের বর্তমান কোনো খেলোয়াড়েরই এর আগে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। তেই বিশ্বমঞ্চের চরম স্নায়ুচাপের মুহূর্তে তরুণ দলটি কতটা স্থির থাকতে পারে, সেটি দেখার বিষয়।

এছাড়াও অতিরিক্ত ওডেগার্ড-হলান্ড নির্ভরতাও তাদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। কারণ কোনো ম্যাচে প্রতিপক্ষ যদি ওডেগার্ডকে পাসিং লেন ব্লক করে বোতলবন্দি করে এবং হলান্ডকে কড়া মার্কিংয়ে রাখে, তবে নরওয়ের আক্রমণের প্ল্যান-বি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক

নরওয়ের বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল ১৯৩৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। সেবার তারা অলিম্পিক ব্রোঞ্জজয়ী দলের সিংহভাগ খেলোয়াড় নিয়ে অংশ নিয়েছিল। গ্রুপ পর্বের বৈতরনী পার করে শেষ ১৬-র লড়াইয়ে ইতালির মুখোমুখি হয়েছিল নরওয়ে। সেই ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ১-১ ড্র করেছিল তারা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে ইতালির সিলভিও পিওলার জয়সূচক গোলে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল নরওয়েকে।

স্মরণীয় যত রেকর্ড

সর্বোচ্চ গোলদাতা : কেতিল রেকডালই একমাত্র নরওয়েজিয়ান ফুটবলার যিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে একাধিক গোল করেছেন। ১৯৯৪ সালে মেক্সিকো এবং ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি করে মোট দুটি গোল করেন তিনি।

সবচেয়ে বেশি ম্যাচ : হেনিং বার্গ, স্টিগ ইঙ্গে বিয়োর্নেবিয়ে এবং কেতিল রেকডাল যৌথভাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে নরওয়ের হয়ে সবচেয়ে বেশি ৭টি করে ম্যাচ খেলেছেন।

সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত : ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ২-১ গোলের জয়ের ম্যাচ। বেবেতোর গোলে ব্রাজিল এগিয়ে যাওয়ার পর তোরে আন্দ্রে ফ্লোর সমতাসূচক গোল এবং ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে কেতিল রেকডালের সেই আইকনিক পেনাল্টি গোল নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহূর্ত।

হলান্ডের সামনে রেকর্ড গড়ার হাতছানি

নরওয়ের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে বেশি দুটি গোলের রেকর্ড আছে কেতিল রেকডালের। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই রেকর্ডটি নিজের করে নেওয়ার সুযোগ থাকছে হলান্ডের সামনে।

২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য

২৮ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে নর্ডিক অঞ্চলের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন কেবল অংশ নেওয়ার জন্য নয়, বরং বিশ্বকাপে নিজেদের জানান দেওয়ার লক্ষ্য নরওয়ের। ওডেগার্ডের পায়ের জাদু আর হলান্ডের অতিমানবীয় গোলের ক্ষুধার ওপর ভর করে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাটিতে নরওয়ের লক্ষ্য নিজেদের ইতিহাসের সাফল্য অর্জন।

নরওয়ের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

গোলকিপার : ওরিয়ান হাস্কজোল্ড হাইলান্ড, এগিল সেলভিক, স্যান্ডার টাংভিক।

ডিফেন্ডার : জুলিয়ান রিয়ারসন, মার্কাস হোমগ্রেন পেডারসেন, ডেভিড মলার উলফ, ফ্রেডরিক বিয়র্কান, ক্রিস্টোফার আয়ের, তরবিয়র্ন হেগেম, লিও স্কিরি অস্টিগার্ড, সন্ড্রে লাঙ্গাস, হেনরিক ফালচেনার।

মিডফিল্ডার : মার্টিন ওডেগার্ড, সান্ডার বার্গ, ফ্রেডরিক আরসনেস, প্যাট্রিক বার্গ, ক্রিস্টিয়ান থর্স্টভেডট, মর্টেন থর্সবি, থেলো আসগার্ড।

ফরোয়ার্ড : আর্লিং হলান্ড, আলেকজান্ডার সরলথ, জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন, আন্তোনিও নুসা, অস্কার বব, আন্দ্রেয়াস শ্জেল্ডারুপ, জেনস পেটার হাউজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *