আড়াই দিনে হারের লজ্জায় বাংলাদেশ

হারারে টেস্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তাইতো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ও ৮৫ রানের বড় হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দলকে।

২৫ বছর আগে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারের স্মৃতি ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। এবার সেই হতাশার রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল এই হার। সেবার বুলাওয়েতে ইনিংস এবং ৩২ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ।

প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৪০ রানে গুটিয়ে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জিম্বাবুয়ে ৪১০ রান তুলে ২৭০ রানের বিশাল লিড নেয়। সেই ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে দ্বিতীয় দিনের শেষ বিকেলে এক উইকেটে ৪০ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তৃতীয় দিনের শুরুতেই ভেঙে পড়ে সেই ভিত্তি।

আজ টেস্টের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় ওভারেই ফেরেন মাহমুদুল হাসান জয়। ২২ রান করা এই ওপেনার ব্লেসিং মুজারাবানির অতিরিক্ত বাউন্স সামলাতে না পেরে ক্যাচ তুলে দেন। এরপর একই বোলারের বলে ১৩ রান করে সাজঘরে ফেরেন মুমিনুল হক। মাত্র ৪৬ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ।

এই অবস্থায় অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম কিছুটা দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন। চতুর্থ উইকেটে ৬০ রানের জুটি গড়ে তারা ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করেন। শান্ত চারটি চারে ৩০ রান করেন, আর মুশফিক করেন ৩৪ রান। তবে দুজনের কেউই ইনিংস বড় করতে পারেননি। শান্ত নিয়ামহুরির বলে বোল্ড হওয়ার পর লাঞ্চের ঠিক আগে মুজারাবানির সুইংয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দেন মুশফিক। তাদের বিদায়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের প্রতিরোধের সম্ভাবনাও।

লাঞ্চের পর ব্যাটিং বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তাওহীদ হৃদয় ৯ রান করে স্লিপে ক্যাচ দেন। তাইজুল ইসলাম ৮ রান করে বিদায় নেন। অমিত হাসান ২৫ রানের কার্যকর ইনিংস খেললেও সেটি কেবল ব্যবধান কমিয়েছে, ম্যাচের গতিপথ বদলাতে পারেনি। খালেদ আহমেদ শূন্য রানে ফিরলে বাংলাদেশের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। শেষদিকে হাসান মাহমুদ ১৫ রান যোগ করলেও ১৮৫ রানেই শেষ হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস।

তৃতীয় দিনে মাত্র ১৪৫ রান যোগ করতে বাংলাদেশ হারিয়েছে নয়টি উইকেট। পুরো দিন ব্যাট করতে পারেনি সফরকারীরা। মাত্র তিন ঘণ্টা ১০ মিনিটেই শেষ হয়ে যায় তাদের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ, সুইং ও বাউন্সের সামনে প্রায় প্রতিটি ব্যাটারই একই ধরনের ভুল করেছেন। বিশেষ করে ব্লেসিং মুজারাবানি ধারাবাহিকভাবে অফ স্টাম্পের বাইরের জায়গায় বল করে বাংলাদেশের ব্যাটারদের ভুল শট খেলতে বাধ্য করেন। তার স্পেলই মূলত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

এই হার বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ম্যাচ হার নয়, বরং সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপরও বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে টেস্ট সিরিজে হারিয়ে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছিল বাংলাদেশ। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সুযোগ ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। কিন্তু টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরের একটি দলের বিপক্ষে এমন একতরফা হার দলের প্রস্তুতি, মানসিকতা ও ব্যাটিং দক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

আরও হতাশার বিষয়, এই ম্যাচে বল হাতে উজ্জ্বল ছিলেন তাইজুল ইসলাম। প্রথম ইনিংসে সাত উইকেট নিয়ে বিদেশের মাটিতে নিজের সেরা বোলিংয়ের কীর্তি গড়েন তিনি। কিন্তু ব্যাটারদের চরম ব্যর্থতায় সেই অর্জনও গুরুত্ব হারিয়েছে। প্রধান কোচ ফিল সিমন্স এবং ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের অধীনে ব্যাটিং বিভাগের উন্নতির যে প্রত্যাশা ছিল, হারারে টেস্টে তার কোনো ছাপ দেখা যায়নি!

সংক্ষিপ্ত স্কোর-

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ১৪০/১০

জিম্বাবুয়ে ১ম ইনিংস: ৪১০/১০

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ১৮৫/১০ (জয় ২২, মুমিনুল ৯, শান্ত ৩০, মুশফিক ৩৪, হৃদয় ৯, অমিত ২৫, তাইজুল ৮, হাসান ১৫, খালেদ ০, ইবাদত ১২*; এনগারাভা ৯-১-৩২-৩, মুজারাবানি ১৭-৩-৬৫-৪, ইভান্স ১১-১-৫৫-১, নিয়ামুরি ৮-০-২৮-২)

ফল: জিম্বাবুয়ে ইনিংস ও ৮৫ রানে জয়ী

এসএন/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *