যুদ্ধের বিরোধিতা এবং অস্ত্র রফতানিতে বন্দর ব্যবহারের প্রতিবাদে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিশ্বের ২২টি দেশের ১১৩টি বন্দরে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন ডকশ্রমিকরা।
আয়োজকদের দাবি, এই কর্মসূচির কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ৪০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হতে পারে। একইসঙ্গে, দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য পরিবহনেও অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথমে ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেনের বাস্ক অঞ্চল, তুরস্ক ও মরক্কোর ডকশ্রমিক ইউনিয়নগুলো এ ধর্মঘটের ডাক দেয়। পরে বিশ্বের ১১৩টি বন্দরের ২৫টিরও বেশি শ্রমিক সংগঠন এতে সমর্থন জানায়। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যিক কেন্দ্রে এ কর্মসূচির প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধর্মঘটের আওতায় থাকা উল্লেখযোগ্য বন্দরগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানির হামবুর্গ, স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া ও আলজেসিরাস, ফ্রান্সের লে আভর, গ্রিসের পিরেয়ুস এবং ইতালির জেনোয়া। ইউরোপের বাইরেও মরক্কোর ট্যানজিয়ার মেড ও ভারতের নাভা শেভা বন্দরে কর্মসূচির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কতসংখ্যক শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেবেন এবং এর ফলে পণ্য পরিবহনে ঠিক কতটা বিঘ্ন ঘটবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইতালির জেনোয়া বন্দরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সেখানে ধর্মঘটের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। অন্যদিকে, গ্রিসের পিরেয়ুস বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দ্বীপগুলোতে ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ধর্মঘটে অংশ নেওয়া শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানির ভের.ডি, আয়ারল্যান্ডের বৃহত্তম শ্রমিক ইউনিয়ন এসআইপিটিইউ, ডেনমার্কের থ্রিএফ এবং ফ্রান্সের সিজিটি পোর্টস এ দকস।
ইউরোপের বাইরেও ভারতের প্রায় এক ডজন বন্দরে কর্মসূচির প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। দেশটির ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়াও (ডব্লিউটিডব্লিউএফআই) ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ধর্মঘটের কারণে শুক্রবার গ্রিসের বন্দরগুলোতে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার কথা রয়েছে। দেশটির ডকশ্রমিক, প্রকৌশলী ও নাবিকদের ইউনিয়নগুলোও কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছে।
গ্রিসের বৃহত্তম বন্দর পিরেয়ুসের ডকশ্রমিকরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পিরেয়ুস থেকে শান্তির বার্তা দেব এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করব।’
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর), স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তারা কাজ বন্ধ রাখবেন। দেশটির অন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোও ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করবে।
অন্যদিকে, ইতালির তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিক সংগঠন ইউনিয়নে সিনদাকালে দি বেসে (ইউএসবি) একই দিনে দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এ উপলক্ষে দেশটির ৪০টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে।
ফিলিস্তিনপন্থি প্রচারাভিযান সংগঠন গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলাও ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ ভেঙে সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে একাধিকবার নৌ-অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছে সংগঠনটি। এবার ধর্মঘটের সমর্থনে পানিতে ‘সমন্বিত ও কৌশলগত কর্মসূচি’ পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য অস্ত্র পরিবহনে ইউরোপের বন্দরগুলোকে ব্যবহার না করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছেন ডকশ্রমিকরা। ২০২৬ সালের মে মাসে, ইউরোপের ৩৫টিরও বেশি দেশের ডকশ্রমিক ইউনিয়নগুলো ‘ইস্তাম্বুল ঘোষণা’ প্রকাশ করে। এতে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে পাঠানোর জন্য অস্ত্র পরিবহনে বন্দর অবকাঠামো ব্যবহার না করার দাবি জানানো হয়।
ইতালির বন্দরগুলো, বিশেষ করে জেনোয়া, অস্ত্রবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর আগে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির উদ্দেশে পাঠানো অস্ত্রবাহী পণ্য আটকে দিয়ে একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশটির শ্রমিক সংগঠনগুলো।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) চলতি বছরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে আয়োজক শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, ‘বিমান থেকে ট্যাংক, বন্দুক থেকে গুলি, বিস্ফোরক থেকে গোলাবারুদ, সামরিক পোশাক থেকে বুট—সবকিছুর ক্ষেত্রেই আমাদের বন্দরগুলো যুদ্ধ ও গণহত্যার জন্য সরবরাহ এবং পণ্য পাঠানোর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।’
তাদের বক্তব্য, যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে বন্দরগুলোর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এই দাবিতেই শুক্রবারের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলোতে একযোগে এ কর্মসূচি পালিত হলে আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহব্যবস্থা, নৌবাণিজ্য এবং বিভিন্ন দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।