মার্কিন চাপের মুখে ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান পেজেশকিয়ানের

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে ইরানের সাধারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। দেশের ভেতরে বিভেদ সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা ব্যর্থ ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য জাতীয় সংহতিই যথেষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। খবর আলজাজিরার।

গত মাসে ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ ঘোষণা করেছিল, যা ছিল মার্কিন ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা। এর লক্ষ্য ছিল ইরানি শাসন ব্যবস্থা ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) টিকিয়ে রাখার সমস্ত অর্থনৈতিক জীবনরেখা ছিন্ন করা। পেজেশকিয়ান বলেন, এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো তার সরকারকে কোনো আকস্মিক নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারবে না, তবে এটি দেশে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।

শুক্রবার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শত্রুরা দেশের অভ্যন্তরে বিভাজন, ফাটল ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়।’ পেজেশকিয়ান সম্ভবত ২০১৯ ও ২০২০ সালের ঘটনাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করছিলেন, যা জ্বালানির উচ্চ মূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হয়ে পরবর্তীতে একটি সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দেশকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মানুষ এখন শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে; আমি যদি তাদের ওপর আরেকটু চাপ প্রয়োগ করি, তবে তারা ভেঙে পড়তে পারে।’ তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, তার প্রশাসন আগামী সপ্তাহগুলোতে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য প্রদত্ত তিন স্তরের পেট্রোল কোটার একটির দাম দ্বিগুণ করবে এবং মাসিক পেট্রোল কোটা কমাবে। 

জ্বালানি চোরাচালান, তেল ও গ্যাস অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অতিরিক্ত জ্বালানিনির্ভর অথচ নিম্নমানের যানবাহনের কারণে ইরান এখনো মারাত্মক জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু পেট্রোলের দাম আরও বাড়লে তা লজিস্টিক খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে, যা ইরানের প্রতিটি পরিবারকে প্রভাবিত করছে বলে প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। 

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সপ্তাহের শুরুতে তেহরানের বাজার খোলার পর ইরানের জাতীয় মুদ্রার মান কমে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সর্বনিম্ন রেকর্ড ২.২৫ মিলিয়ন রিয়ালে নেমে এসেছে। এদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত কমে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই সংঘাত তেহরানের বর্তমান অর্থনৈতিক পতনের প্রধান অনুঘটক।

দক্ষিণ ইরান ও হরমুজ প্রণালিতে একাধিক আক্রমণের কয়েকদিন পর, আজ শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের খার্গ দ্বীপের কাছে একটি তেল ট্যাঙ্কারে বোমা হামলা চালিয়েছে। অশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধ করার জন্য নৌ-অবরোধের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন দেশটির দক্ষিণ উপকূল ত্যাগ করতে ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোকে বাধা দিয়েছে। ইরান সরকার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত কিন্তু কিছুদিন পরই ভেস্তে যাওয়া সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলোতে তারা ফিরে আসবে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একই কাজ করে। 

‘ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা’ 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং জনগণের তীব্র অসন্তোষ ইরানি কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করতে বাধ্য করেছে। আগস্টের শেষে আইআরজিসি’র গোয়েন্দা পরিদপ্তর দাবি করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের পশ্চিমা মিত্ররা ইরানিদের দিয়ে প্রতিবাদ করাতে ভেতর থেকে চাপ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। 

গত সপ্তাহে বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মহসেনি-এজেই সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরানের শত্রুরা বিশৃঙ্খলা উসকে দিতে চায় এবং যারা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করতে গিয়ে ধরা পড়বে, তাদের বিচারকরা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠোরভাবে শাস্তি দেবেন।  সংসদের স্পিকার এবং প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক আলোচনা এবং জনগণকে প্রদত্ত অর্থনৈতিক পরিষেবাকে প্রথম তিনটি উপাদান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চতুর্থ যুদ্ধক্ষেত্র হলো রাজপথ—অর্থাৎ সামাজিক ক্ষেত্র। 

ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান জীবিকা, বেকারত্ব, অর্থনীতি ও পেট্রোলকে স্থানীয় বা দেশব্যাপী প্রতিবাদের সম্ভাব্য অজুহাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি যেকোনো বিশৃঙ্খলার মোকাবিলার জন্য ক্রমাগত নজরদারি এবং তার অধীনে থাকা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। 

আগস্টের শেষভাগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রচারিত সর্বশেষ বার্তাতেও জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া দেখা গেছে। ওই বিবৃতিতে খামেনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছি যে, সামাজিক সংহতির জন্য ক্ষতিকর যেকোনো কিছু নিষিদ্ধ থাকবে।’

এদিকে, জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃপক্ষ শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইরানের সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চিত করেছে যে, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাদেক সায়েদিনিয়াকে অন্তত সাড়ে ১২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে এবং জানুয়ারির দেশব্যাপী প্রতিবাদকে সমর্থন করার অভিযোগে রাষ্ট্র তার লাখ লাখ ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে। 

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানুয়ারির এই দেশব্যাপী প্রতিবাদকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত এবং দেশের ভেতরে তাদের সশস্ত্র এজেন্টদের দ্বারা বাস্তবায়িত একটি ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে বিবেচনা করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিচার বিভাগ যে ডজন ডজন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, তাদের কয়েকজন এই প্রতিবাদের সাথে জড়িত ছিল বলে জানানো হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *