ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি – রোহিণী নক্ষত্রে, মথুরার কারাগারে, কংসের অত্যাচারের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন এক দিব্যশিশু। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সেই পবিত্র তিথিটিই জন্মাষ্টমী (Janmastami 2026) নামে সারা বিশ্বে পালিত হয়। 2026 সালে জন্মাষ্টমী পালিত হবে ৪ঠা সেপ্টেম্বর, শুক্রবার।
সনাতন ধর্মে জন্মাষ্টমী কেবল একটি জন্মদিন নয় – এটি অধর্মের বিনাশ ও ধর্মের পুনঃস্থাপনের প্রতীক। গীতা যেমন বলে – যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ – যখনই ধর্মের পতন হয়, তখনই ভগবান মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। এই পৃষ্ঠায় আমরা বিস্তারিত দিচ্ছি – জন্মাষ্টমীর নির্ঘণ্ট, নিশীথ পূজার সঠিক সময়, উপবাস পালনের নিয়ম, ছপ্পন্ন ভোগের তালিকা, দহি হান্ডি উৎসব এবং জন্মাষ্টমী উদযাপনের বিভিন্ন রীতি।
জন্মাষ্টমী 2026 পূর্ণাঙ্গ নির্ঘণ্ট – অষ্টমী তিথি ও পূজার সময়
2026 সালের শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর সঠিক নির্ঘণ্ট ও তিথির সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:
- জন্মাষ্টমীর ইংরেজি তারিখ: ৪ সেপ্টেম্বর 2026, শুক্রবার।
- জন্মাষ্টমীর বাংলা তারিখ: ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩।
- অষ্টমী তিথি শুরু: ৩ সেপ্টেম্বর 2026, বৃহস্পতিবার রাত ১:২২ মিনিটে (মধ্যরাতের পর)।
- অষ্টমী তিথি সমাপ্ত: ৪ সেপ্টেম্বর 2026, শুক্রবার রাত ১১:০২ মিনিটে।
- রোহিণী নক্ষত্র: ৪ সেপ্টেম্বর 2026 সারা রাত বিরাজমান, যা জন্মাষ্টমীর জন্য অত্যন্ত শুভ যোগ।
- নিশীথ পূজার সময় (Nishita Puja Muhurat): ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১১:৫৯ মিনিট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২:৪৫ মিনিট পর্যন্ত।
শাস্ত্র মতে, যেদিন রোহিণী নক্ষত্র ও অষ্টমী তিথির সমন্বয় হয় এবং মধ্যরাত্রি বেলা অষ্টমী থাকে, সেদিনই জন্মাষ্টমী পালন করা সবচেয়ে শ্রেয়। 2026 সালে এই যোগ অত্যন্ত অনুকূল।
জন্মাষ্টমী উপবাস – কী খাবেন, কী খাবেন না
জন্মাষ্টমী উপবাস (Vrat) পালনের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। অনেকে নির্জলা উপবাস করেন – অর্থাৎ সারাদিন একবিন্দু জলও পান করেন না। যাঁরা পারছেন না, তাঁরা ফল-দুধ-সাবু খেয়ে উপবাস পালন করতে পারেন। তবে শস্যদানা বা অন্ন গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপবাস ভঙ্গ করতে হয় দ্বাদশীর দিন নির্দিষ্ট পারণ সময়ের মধ্যে।
যেসব খাবার খেতে পারেন: দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (ঘোল, ছানা, মাখন – কৃষ্ণের প্রিয়), তাজা ফল (বিশেষ করে কলা ও আঙুর), সাবু (সাগু), সিঙাড়া বাদাম, কিশমিশ, মিছরি, লাড্ডু, ফলাহারি কচুরি ইত্যাদি। যেসব খাবার নিষিদ্ধ: ভাত, রুটি, ডাল, সবজি (শস্যদানা জাতীয় সবকিছু), পেঁয়াজ, রসুন, আমিষ আহার।
ছপ্পন্ন ভোগ (Chhappan Bhog) – কৃষ্ণের প্রিয় ৫৬ পদ
জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ছপ্পন্ন ভোগ (Chhappan Bhog)। গোবর্ধন পাহাড় ধারণের সময় কৃষ্ণ ইন্দ্রের প্রচণ্ড বর্ষণ থেকে বৃন্দাবনের মানুষদের বাঁচাতে টানা সাত দিন পাহাড় আঙুলে তুলে রেখেছিলেন। সাত দিনে আট পহর করে মোট ৫৬ পহর – প্রতিটি পহরের জন্য একটি করে মোট ৫৬ প্রকারের খাবার কৃষ্ণকে নিবেদন করা হয়। প্রধান পদগুলির মধ্যে থাকে – মাখন, মিছরি, ক্ষীর, মালপোয়া, পায়েস, মোহনভোগ, রাবড়ি, অমৃতি, জিলিপি, গজা, গুলাব জামুন, চন্দ্রকলা, দইবড়া, খুরমা, মঠরি, মেওয়া, ছানা, সন্দেশ, রসমালাই, পেড়া, বরফি – আরও নানা মিষ্টি ও নোনতা পদ। ভক্তরা বাড়িতে সম্ভবমতো ৫৬টি বা ২১টি বা অন্তত ৫টি পদ নিবেদন করে কৃষ্ণকে তুষ্ট করেন।
দহি হান্ডি – কৃষ্ণের বাল্যলীলার উদযাপন
মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের সবচেয়ে প্রাণবন্ত জন্মাষ্টমী উদযাপন হলো দহি হান্ডি (Dahi Handi)। বাড়ির ছাদে বা উঁচুতে মাটির হাঁড়িতে দই, মাখন, ঘোল বেঁধে রাখা হয়। তারপর তরুণরা মানুষের পিরামিড তৈরি করে সেই হাঁড়ি ভেঙে ফেলে – ঠিক যেভাবে ছোট্ট কৃষ্ণ গোপিনীদের বাড়ির মাখনের হাঁড়ি চুরি করে খেতেন। 2026 সালেও মুম্বাই, পুণে, ঠাণে সহ মহারাষ্ট্রের প্রতি গলিতে গলিতে দহি হান্ডির আয়োজন হবে। দলগুলোকে ‘গোবিন্দা’ বলা হয় এবং বিজয়ী দলকে পুরস্কৃত করা হয়।
নন্দোৎসব – জন্মের পরদিনের আনন্দ
জন্মাষ্টমীর পরের দিন পালিত হয় নন্দোৎসব (Nandotsav) – কৃষ্ণের জন্মের পর নন্দ মহারাজ ও যশোদা মায়ের আনন্দোৎসব। এদিন কৃষ্ণকে বিভিন্ন ধরনের ভোগ নিবেদন করা হয় এবং সবাই মিলে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। বৃন্দাবনের মন্দিরে, বিশেষ করে বাঁকে বিহারী মন্দির ও ইসকন মন্দিরে নন্দোৎসব মহাসমারোহে পালিত হয়।
ভারতের বিখ্যাত জন্মাষ্টমী উদযাপন স্থল
মথুরা-বৃন্দাবন (উত্তরপ্রদেশ): কৃষ্ণের জন্মস্থান ও লীলাভূমি – এখানে জন্মাষ্টমী মানেই অতি জাঁকজমক। কৃষ্ণজন্মস্থান মন্দির, বাঁকে বিহারী মন্দির, দ্বারকাধীশ মন্দিরে পূজা ও উৎসব দেখার মতো। দ্বারকা (গুজরাট): ভগবান কৃষ্ণের প্রতিষ্ঠিত নগরী – এখানে দ্বারকাধীশ মন্দিরে বিশেষ পূজা হয়। মায়াপুর (পশ্চিমবঙ্গ): ইসকন-এর আন্তর্জাতিক প্রধান কেন্দ্র – এখানে জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের হয়। উডুপি (কর্ণাটক): শাস্ত্রীয় কৃষ্ণ মন্দিরের জন্য বিখ্যাত, যেখানে জন্মাষ্টমী দশ দিন ধরে চলে।