ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী আন্তঃনগর ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ ট্রেন চলন্ত অবস্থায় এক নারীকে (৪৪) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ওই নারীর অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে ধর্ষণ করেছে ক্যান্টিন বয় আবু বকর সিদ্দিক। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করেছে আবু বকর সিদ্দিক।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার আমলী আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অভিযুক্ত আবু বকর সিদ্দিক দাবি করেছে ওই নারীর কারণেই তাদের মধ্যে চলন্ত ট্রেনের ক্যান্টিনে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। তবে সেটি ধর্ষণ নয়। দুজনের সমঝোতার ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে।
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি রেকর্ডের পর আদালত আবু বকর সিদ্দিককে বগুড়ার জেলা কারাগারে পাঠিয়েছে এবং শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিকেল টেস্টের পর ওই নারীকে তার ছেলের জিম্মায় হস্তান্তর করেছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় সান্তাহার রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল উদ্দিন বলেন, রোববার দিনগত রাতে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী আন্তঃনগর ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ ট্রেনে বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছিলেন ওই নারী। ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ওই ট্রেনে ওঠেন। ট্রেনে ওঠার পরে সন্দেহ হলে ট্রেনের পুলিশ সদস্যরা তার ব্যাগ তল্লাশি করেন। পুলিশ সদস্যরা জানতে চান তিনি কোথায় যাবেন। ওই নারী বলেন সিরাজগঞ্জে। পুলিশ সদস্যরা ওই নারীকে বলেন এই ট্রেনের স্টপেজ সিরাজগঞ্জে নেই। তখন ওই নারী পুলিশ সদস্যদের জানান, তিনি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে আত্মীয়র বাড়িতে যাবেন। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাকে ট্রেনের ক্যান্টিনে বসিয়ে রেখে চলে যান।
ওসি দুলাল উদ্দিন আরও বলেন, ৩১ আগস্ট, সোমবার ভোর চারটার দিকে ওই নারী জরুরি পুলিশ সেবা ৯৯৯-এ কল করে অভিযোগ করেন চলন্ত ট্রেনে পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ৯৯৯-এর কলের ভিত্তিতে সান্তাহার রেলওয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক ট্রেনের লোকেশন ট্র্যাক করে পার্বতীপুর রেলওয়ে পুলিশকে ভিকটিম উদ্ধার এবং অভিযুক্তকে আটক করার অনুরোধ জানায়। ট্রেনটি পার্বতীপুর জংশন স্টেশনে পৌঁছালে পার্বতীপুর রেলওয়ে থানা-পুলিশ ভিকটিমকে উদ্ধার করে এবং অভিযুক্তকে আটক করে। পরে রাজশাহীগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনে ওই দুজনকে পুলিশ প্রহরায় সান্তাহার রেলওয়ে পুলিশের কাছে নিয়ে আসা হয়।
৩১ আগস্ট, সোমবার সন্ধ্যায় ওই নারীর ছেলে ঢাকা থেকে একতা এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেন যোগ সান্তাহার আসে। তার ছেলের উপস্থিতিতে ওই নারী মহিলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এবং পুলিশ সদস্য কর্তৃক টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সান্তাহার জিআরপি থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনের ক্যান্টিন বয় আবু বকর সিদ্দিকের নাম উল্লেখ করে এবং দুজন পুলিশ সদস্যকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অজ্ঞাতনামা ওই দুই পুলিশ সদস্য তার কাছে থাকা ১০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে এবং তাদের উপস্থিতিতেই ক্যান্টিন বয় আবু বকর সিদ্দিক তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে।
মামলার তদন্তকারী অফিসার সান্তাহার জিআরপি থানার উপপরিদর্শক (এস আই) মাহফুজুর রহমান জানান, মঙ্গলবার অভিযুক্ত আবু বকর সিদ্দিককে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়। আদালত মামলার শুনানি চলাকালে অভিযুক্ত আবু বকর সিদ্দিক ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করতে রাজি হয়। বিজ্ঞ আদালত অভিযুক্ত আবু বকর সিদ্দিকের ১৬৪ ধারা জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও বলেন, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে অভিযুক্ত আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ৩১ আগস্ট, সোমবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেন ঈশ্বরদী বাইপাস ছেড়ে আসার পর নাটোর পৌঁছানোর আগে সে ক্যান্টিনে এসে দেখে ওই নারী বসে আছে। আবু বকর সিদ্দিক ওই নারীকে বলেন আমার ডিউটি শেষ আমি ঘুমাবো, আপনি অন্যত্র যান। ওই নারী আবু বকর সিদ্দিককে ঘুমাতে বলে এবং কিছুক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করে চলে যাবেন বলে জানান। বিছানা পেতে আবু বকর সিদ্দিক ঘুমানোর সময় বুঝতে পারে তার পাশে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। এরপর উভয়ের সম্মতিতে তাদের মধ্যেও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন হয়।
আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ওই সময় সেখানে কোন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। এরপরে ওই নারী বিছানা থেকে উঠে বসেন। এরপরে তার ছেলেসহ কয়েকটা জায়গায় কল করেন। ঘটনার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ভোর চারটার দিকে ৯৯৯-এ কল করে অভিযোগ করলে পার্বতীপুর রেলওয়ে পুলিশ তাকেসহ ওই নারীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পরে বিজ্ঞ আদালত অভিযুক্ত আবু বকর সিদ্দিককে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে ওই দুই পুলিশ সদস্যকে এখনো শনাক্ত করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। তাদের শনাক্ত করতে জিআরপি পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।
এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই নারীর মেডিকেল চেকআপ শেষে তাকে তার ছেলের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
জিআরপি পুলিশ জানায়, ওই নারী সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তিনি তার তিন সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। অভিযুক্ত আবু বক্কর সিদ্দিকের বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলায়।