অবসরের প্রশ্নে লিওনেল মেসি বরাবরই বলে এসেছেন, যতদিন খেলাটা উপভোগ করবেন, ততদিন খেলাটা চালিয়ে যেতে চান তিনি। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও ছায়া হয়ে থাকা বাবার প্রয়াণের পর এবার আর ফুটবলকে দীর্ঘায়িত করলেন না আর্জেন্টাইন মহাতারকা। দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে নীল-সাদা জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।
আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান মেসি।
অবসরের ঘোষণা দিয়ে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে মেসি লিখেছেন, ‘ফাইনালের পর এতদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার পর, আমি সবাইকে জানাতে চাই যে আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি…’
২০৩০ বিশ্বকাপ আসতে আসতে মেসির বয়স হবে ৪৩ বছর। তখন হয়তো নিজের সেরা ছন্দে থাকবেন না মেসি। তাই অবসরের জন্য এটাকেই সেরা সময় মনে করছেন তিনি।
মেসি লিখেছেন, ‘এটি এমন এক সিদ্ধান্ত যা আমার আত্মাকে ব্যথিত করেছে এবং এখনও করছে, তবে আমি বুঝতে পারছি যে এটাই সঠিক সময়। আমি আপনাদের কসম কেটে বলছি, সবসময় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি—শুধু গত কয়েক বছরে যা কিছু জিতেছি তখন নয়, তার আগেও।’
বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জিতেছেন মেসি। ছবি : এএফপি
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের প্রতি মেসির বার্তা, ‘এই জার্সির জন্য, আপনাদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ববোধ করানোর জন্য আমি সবসময় লড়াই করেছি এবং সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছি।’
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির অভিষেক ২০০৫ সালে। এরপর দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। তবে শিরোপা জয়ের শুরুটা ২০২১ সাল থেকে। দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমার পর ২০২২ সালে মরুর বুকে বিশ্বকাপের শিরোপা উচিয়ে ধরে ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতাও ঘুচিয়েছেন মেসি। সব জেতার পর মেসি মনে করেন, তার আর কিছু দেওয়ার নেই।
Advertisement
মেসি লিখেছেন, ‘সময় খুব অল্প বাকি আর এভাবে একেকটি অধ্যায় শেষ হয়ে যায়; এটি তেমনই একটি অধ্যায় যা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। আমি জাতীয় দলের অংশ হতে সবসময় ভালোবেসেছি, ভালোবাসি এবং ভালোবেসে যাব। নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছি, আমার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। তাছাড়া পেছনে অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যাদের (জাতীয় দলে) থাকাটা প্রাপ্য।’
আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে ২০৭ ম্যাচে মাঠে নেমে গোল করেছেন ১২৫টি। আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে মেসির চেয়ে আর বেশি গোল নেই কারো। আন্তর্জাতিক ফুটবলেই তার চেয়ে বেশি গোল আছে কেবল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর।
২০২২ সালে কাতারে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতে সোনালী ট্রফি ছুঁয়ে দেখছেন লিওনেল মেসি। ছবি : এএফপি
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিল, এবার হয়তো অবসর নেবেন মেসি। তবে তাদের ভুল প্রমাণ করে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপেও মাঠে নামেন তিনি। শুধু মাঠে নামাই নয়, লিখেছেন নতুন নতুন ইতিহাসও। যদিও শেষটা সুন্দর হয়নি। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তোলা হয়নি মেসিদের।
বিশ্বকাপের পরই অবসরের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেসি। বাবার মারা যাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেন আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সেই কথা জানিয়ে মেসি বলেন, ‘এই কথাগুলো আমি গত ২১ জুলাই, ফাইনালের দুদিন পর লিখেছিলাম। আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে তার পর, আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’
সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি লিখেছেন, ‘গত ২০ বছরের সমস্ত ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতরে আপনাদের চিৎকার ও সমর্থন শোনাটা খুব মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদের মতোই একজন হয়ে যাব, যে বাইরে থেকে সবসময় দলকে সমর্থন দিয়ে যাবে এবং পাশে থাকবে (ভালো সময়ে তো বটেই, খারাপ সময়ে আরও বেশি)।’
বিশ্বকাপ জয়ের আগের বছর ২০২১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার ট্রফি উদযাপন করছেন মেসি। ছবি : এএফপি
মেসি ধন্যবাদ জানিয়েছেন পরিবার, সতীর্থ ও কোচদের প্রতিও, ‘আমার পরিবারকে সবসময় পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ, এত সুন্দর কিন্তু কঠিন একটি যাত্রায় আমার সঙ্গী হওয়ার জন্য। যেসব কোচ, সতীর্থ এবং কর্মকর্তাদের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ। অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি আর মুহূর্ত সাথে নিয়ে যাচ্ছি।’
শান্তি আর গর্ব নিয়ে বিদায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাঁ-পায়ের ফুটবল জাদুকর লিখেছেন, ‘সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে আপনাদের স্বপ্নের মতো কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে পারার শান্তি আর গর্ব নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি। আপনাদের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে বেঁচে থাকা সত্যিই এক উন্মাদনার মতো ছিল। সবাইকে ভালোবাসি!’

ঈশ্বরকে দিয়ে ধন্যবাদ নিয়ে মেসি বলেন, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ভামোস আর্জেন্টিনা!’


