ফিফা কি ইনফান্তিনোকে অপসারণ করতে পারবে, নিয়ম কী বলে?

ফিফা সভাপতি হিসেবে সময়টা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে তিনি এখন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও বিতর্ক তার পিছু ছাড়ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জিয়ার্ড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিফার নতুন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘আইএফএ ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই)-এর ২০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। কিন্তু এই পদক্ষেপে তীব্র আপত্তি জানায় উয়েফা, কনকাকাফ, এএফসি ও বহু জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

এমনকি হোয়াইট হাউজ টাস্ক ফোর্সের ফিফা উপদেষ্টা কার্লোস কোরদেইরোও প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন। ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন ল্যামোরও এই পরিকল্পনাকে স্বচ্ছতার অভাব বলে মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শেষ পর্যন্ত ১৪৩টি দেশের তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় ফিফা। তবে উয়েফা এখানেই থেমে থাকেনি। তারা ইনফান্তিনোর ওপর থেকে পুরোপুরি আস্থা হারানোর ঘোষণা দিয়েছে। আর তাতেই ফুটবল বিশ্বে বড় এক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে— এই বিতর্কের পর কি ইনফান্তিনোকে ফিফা সভাপতির পদ থেকে সরানো সম্ভব?

ফিফার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সরাসরি ‘অভিসংশন’ বা ইমপিচমেন্টের কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা নেই। তবে তাকে সরানোর পথ যে খোলা নেই এমনটাও নয়। সেক্ষেত্রে একটা পথ খোলা আছে— ‘অনাস্থা ভোট’।

এই অনাস্থা ভোট আয়োজন করতে হলে ফিফা পরিষদের ৩৭ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ১৯ জনের ভোট প্রয়োজন হবে। এরপর সেই ভোট কংগ্রেসে পাস করাতে হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ১০৬টি দেশের সমর্থন লাগবে।

যদিও ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ১৪৩টি দেশ অবস্থান নিয়েছিল, তবে বাস্তবে এই বিরোধিতাকে ভোটের বাক্সে রূপ দিয়ে তাকে অপসারণ করা বেশ কঠিনই হবে। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কাতার রাজপরিবারের সঙ্গে বেশ ভালো ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ইনফান্তিনোর।

ফলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে আগামী বছর হতে যাওয়া নির্বাচন। আগামী ২০২৭ সালের জন্য ফিফা সভাপতির পুনঃনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে সাবেক উয়েফা সেক্রেটারি জেনারেল ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ২০০ দেশের সমর্থনপত্র পাওয়ার দাবি করেছেন। তবে লড়াই জমিয়ে তুলতে হলে এই দেশগুলোকে প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর দিক থেকে নিজেদের সমর্থন প্রত্যাহার করতে হবে।

আগামী বছর ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে ফিফা কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। যেখানে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে লড়ার মতো শক্ত কোনো মুখ এখনো সামনে আসেনি। আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বর্তমান যুগে ক্ষমতাসীন কোনো ফিফা প্রেসিডেন্টের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে মাত্র একবার। ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের জোয়াও হাভেলাঙ্গে তৎকালীন প্রধান স্যার স্ট্যানলি রাউসকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, অনাস্থা ভোট বা নির্বাচনের জটিলতার চেয়ে ইনফান্তিনোর বিদায়ের সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে তার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। বড় বড় ফুটবল শক্তি ও মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর অনবরত চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত হয়তো পদত্যাগপত্রে সই করতেই বাধ্য হতে পারেন এই সুইস-ইতালিয়ান ফুটবল প্রশাসক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *