জেফরি এপস্টেইনের সম্পত্তির কাগজপত্রে একটি বিপুল মূল্যের হীরার আংটি রয়েছে, যা ‘বিয়ের জন্য আগ্রহী’ এক নারীর জন্য নির্ধারিত ছিল। সেই নারী হলেন ডা. কারিনা শুলিয়াক। বেলারুশের ৩৭ বছর বয়সী এই নারী পেশায় একজন দন্তচিকিৎসক। তার সঙ্গে এপস্টেইনের প্রায় আট বছর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে কারাগারের সেলে মারা যাওয়ার আগে ফোনে এপস্টেইন তার সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেছিলেন। খবর এনডিটিভির।
এপস্টেইনের উইলের শর্তানুযায়ী, কারিনা শুলিয়াক একটি ৩৩ ক্যারেটের হীরার আংটিসহ ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত এই ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ককে প্রায় পুরোপুরি আড়ালে রেখেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যখন এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তাদের তদন্তের সময় সংগৃহীত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার ফাইল ও ই-মেইল প্রকাশ করে, তখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এর ভেতরে শুলিয়াক ও এপস্টেইনের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া হাজার হাজার ব্যক্তিগত বার্তা এবং তাদের সম্পর্কের প্রমাণস্বরূপ কয়েক ডজন ছবি পাওয়া যায়।
কে এই কারিনা শুলিয়াক?
ফাইলগুলো নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনায় প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, এপস্টেইনের বলয়ে থাকা সবার মধ্যে শুলিয়াককে একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা যায়। ডা. শুলিয়াক নিজেকে কখনও এপস্টেইনের শিকারদের একজন হিসেবে বর্ণনা করেননি। এমনকি, ফেডারেল কর্তৃপক্ষও তাকে তার যৌন পাচার চক্রের সহ-ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে কখনও বিবেচনা করেনি।
এপস্টেইন ও শুলিয়াকের মধ্যে আদান প্রদান হওয়া ই-মেইলগুলো থেকে যা প্রকাশ পায় তা হলো অর্থ, নির্ভরশীলতা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি সম্পর্ক। এপস্টেইন শুলিয়াককে তার ‘প্রিয়তমা’ বলে ডাকতেন। এপস্টেইন প্রায়ই বলতেন, তিনি শুলিয়াককে ভালোবাসেন। শুলিয়াক অবাধে এপস্টেইনের একটি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতেন, তার খরচে বিশ্ব ভ্রমণ করতেন এবং তার কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ ডলার পেয়েছেন। এমনকি শুলিয়াক বেলারুশে তার বাবা-মায়ের কাছেও কয়েক হাজার ডলার পাঠিয়েছেন।
ই-মেইলগুলোতে যৌনতা নিয়ে মতবিরোধ, দম্পতিদের জন্য একটি যৌন স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তি এবং মাঝেমধ্যে আপত্তিকর ভিডিওর লিঙ্ক আদান প্রদান করার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং ব্রণের চিকিৎসার মতো বিষয়গুলোও তারা আদান-প্রদান করতেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুলিয়াক এপস্টেইনের জগতে সত্যিকারের দায়িত্বশীল একজন হয়ে ওঠেন। শুলিয়াক এপস্টেইনের সম্পত্তি ও কর্মীদের পরিচালনায় সাহায্য করতেন। এমনকি, ২০১৯ সালে এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মরক্কোতে একটি প্রাসাদ কেনার প্রচেষ্টাতেও ভূমিকা রাখেন শুলিয়াক। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুলিয়াকের সঙ্গে সম্পর্কের লাগাম সবসময় এপস্টেইনের হাতেই ছিল। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে পেশাগত, ব্যক্তিগত ও আর্থিকভাবে শুলিয়াক এর থেকে লাভবান হয়েছেন।
ম্যানহাটনে আকস্মিক সাক্ষাৎ
শুলিয়াক নিউইয়র্কে মাত্র ৯ মাস ধরে বসবাস করার একপর্যায়ে ২০১১ সালের মার্চের শেষের দিকে এপস্টেইনের সঙ্গে তার দেখা হয়। তখন এপস্টেইনের বয়স ছিল ৫৮ বছর। শুলিয়াক বেলারুশ থেকে একটি অস্থায়ী শিক্ষার্থী ভিসায় ইংরেজি পড়তে এসেছিলেন। এ সময় শুলিয়াক ঘণ্টায় প্রায় ১৫ ডলারের বিনিময়ে একজন ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ওয়েট্রেসের চাকরির জন্য আবেদন করছিলেন। তার শুরু করা ডেন্টাল প্রশিক্ষণটি কীভাবে শেষ করবেন তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
এপস্টেইনের গোপন ফাইলের তথ্য অনুযায়ী, সাইবেরিয়ার এক তরুণী তাদের দুজনের পরিচয় করিয়ে দেন। সেই নারী পরে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, মাঝেমধ্যে তাকে অন্য তরুণীদের এপস্টেইনের কাছে নিয়ে যেতে বলা হতো, সম্ভবত যাতে তিনি যৌন উত্তেজক ম্যাসাজ করাতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, শুলিয়াকের ক্ষেত্রেও তার একই উদ্দেশ্য ছিল।
নথি থেকে দেখা যায়, এপস্টেইন শুরুর দিকে শুলিয়াকের প্রশংসা করতেন। তাকে উপহারে ভরিয়ে দিতেন এবং দন্তচিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নপূরণে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু শুলিয়াক এতে আপত্তি জানান। তার সঙ্গে দেখা করার কয়েক সপ্তাহ পর শুলিয়াক এপস্টেইনকে চিঠি লিখে তাকে একজন ‘অসাধারণ ব্যক্তি’ বলে অভিহিত করেন। তবে জানান, তিনি এপস্টেইনের সাহায্য গ্রহণ করতে পারবেন না।
এপস্টাইন না-সূচক উত্তর মেনে নেননি। তিনি শুলিয়াকের পিছু ছাড়েননি। কয়েক মাসের মধ্যেই শুলিয়াক নিউ মেক্সিকোতে তার খামারবাড়ি এবং ইউএস ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে তার ব্যক্তিগত দ্বীপ পরিদর্শন করেছিলেন।
যদিও তাদের সাক্ষাতের আগেই এপস্টাইন ফ্লোরিডায় এক নাবালিকা মেয়ের কাছ থেকে পতিতাবৃত্তি চাওয়ার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছিলেন এবং আরও কয়েক ডজন কিশোরীকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন।
শুলিয়াক ছোটবেলা থেকেই একজন দন্তচিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে তিনি মিনস্কে পাঁচ বছরের দন্তচিকিৎসা প্রশিক্ষণের মধ্যে চার বছর সম্পন্ন করেছিলেন। ২০১২ সালের শীতের মধ্যে তিনি এপস্টাইনকে তাকে ডেন্টাল স্কুলে ভর্তি হতে সাহায্য করার সুযোগ দেন। কলম্বিয়ার কলেজ অব ডেন্টাল মেডিসিন প্রথমে শুলিয়াককে প্রত্যাখ্যান করে। তাই এপস্টাইন তার নিজের দন্তচিকিৎসক, যিনি ওই প্রতিষ্ঠানের একজন বিশিষ্ট প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাকে ডিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে বলেন এপস্টেইন। এপস্টেইন ওই প্রতিষ্ঠানকে ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব দেন। নথি থেকে দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ডলার দিয়েছিলেন।
বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত নথিপত্রে এমন কিছু টেক্সট মেসেজ রয়েছে, যা থেকে দেখা যায়—স্কুলের প্রশাসক ডা. ম্যাগন্যানি ও ডা. জেমস ফাইন শুলিয়াককে একজন ট্রান্সফার শিক্ষার্থী হিসেবে তার ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই করার জন্য আয়োজিত ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের একটি পরীক্ষায় কোন কোন বিষয় আসবে, সে সম্পর্কে আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।
ভর্তি হওয়ার পর এপস্টেইন তার মাকে বেলারুশ থেকে বেড়াতে নিয়ে আসেন। পরবর্তী তিন বছরের জন্য তার টিউশন ফি প্রদান করেন এপস্টেইন। ২০১২ সালের জুন মাসে শুলিয়াক এপস্টেইনকে লিখেছিলেন, তুমি সব পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র মানুষ। তোমার সমস্ত ভালোবাসা ও যত্ন, আমার বাবা-মা, স্কুল, অ্যাপার্টমেন্ট। সবকিছুর জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
জানা যায়, এপস্টেইনের বিশের কোঠায় থাকা অন্য নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জেদ নিয়ে শুলিয়াকের সঙ্গে ঝগড়া হতো। ২০১২ সালের আগস্ট মাসে তিনি এপস্টেইনকে লিখেছিলেন, আমি বুঝি তোমার এটা প্রয়োজন, কিন্তু এই বিষয়গুলো আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। আমার কাছে কিছুটা নোংরা লাগে।
শুলিয়াক কেবল এপস্টেইনের জীবনের এই অংশ থেকে তাকে দূরে রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, যদি এটা খুব বেশি চাওয়া না হয়, তবে দয়া করে এটা উপভোগ করো কিন্তু আমাকে এর থেকে দূরে রেখো। যাই ঘটুক না কেন, আমি তোমার সঙ্গে থাকব, যতক্ষণ খুশি তুমি থাকবে। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
যে বিয়ে তার নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেছিল
২০১২ সালে যখন শুলিয়াক কলম্বিয়ার কলেজ অব ডেন্টালে আবেদন করে, ততদিনে তার স্টুডেন্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০১৩ সালের শুরুর দিকে এপস্টেইন তাকে দেশে রাখার একটি উপায় বের করে। সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, সেখানকার দুই নারীর মধ্যে বিয়েই নাগরিকত্ব পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ। সে তার নিজের একজন সহকারী এবং একজন ভুক্তভোগীকে কনে হিসেবে বেছে নেয়।
ই-মেইল থেকে দেখা যায়, এপস্টাইন ওই নারীকে ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে নিউইয়র্ক সিটি ম্যারেজ ব্যুরোতে শুলিয়াকের সঙ্গে দেখা করতে নির্দেশ দিয়েছিল। তিন সপ্তাহ পরে সিটি ক্লার্কের অফিসে দুই নারীর বিয়ে হয় এবং সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ছবি তোলা হয়।
এরপরে, এপস্টেইনের হয়ে কাজ করা একজন অভিবাসন আইনজীবী শুলিয়াককে ওই নারীর স্ত্রী এবং সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করে কাগজপত্র দাখিল করেন। এর কয়েক মাস পরে তিনি একটি গ্রিন কার্ড পান।
২০১৮ সালের মে মাসে শুলিয়াক মার্কিন নাগরিক হন। এক বছর পর এ দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ওই নারী দাবি করেন, তিনি বুঝতে পারেননি শুলিয়াকের নিজের নির্বাসন শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল।
শেষ ফোন কল
২০১৯ সালের শুরুর দিকে, বাহ্যিকভাবে এই জুটিকে একটি দম্পতি হিসেবেই মনে হচ্ছিল। শুলিয়াক বেশিরভাগ সময় এপস্টেইনের নিউইয়র্কের ম্যানশনে থাকতেন। ২০১৫ সালে ডেন্টাল স্কুল শেষ করার পর, তিনি ততদিনে ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস, ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত দন্তচিকিৎসক হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, যদিও তিনি নিজের কোনো বড় ক্লায়েন্ট বেস তৈরি করেছিলেন এমন কোনো প্রমাণ নেই।
এর পরিবর্তে, তার বেশিরভাগ সময় কাটত এপস্টেইনের সংসারের কাজকর্ম সামলাতে। তিনি এপস্টেইনের প্রাসাদের জন্য ফুলের সজ্জার ব্যবস্থা করতেন, তার দ্বীপের জন্য আসবাবপত্রের অর্ডার দিতেন এবং ফ্ল্যাটগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মেরামতের সময়সূচি পরিচালনা করতেন।
২০১৯ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে, তারা দুজন একসঙ্গে প্যারিসে গিয়েছিলেন, যেখানে এপস্টেইনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। ৬ জুলাই তিনি বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন, আর শুলিয়াক ইউরোপেই থেকে যান। নিউ জার্সির টেটারবোরো বিমানবন্দরে এপস্টেইনের বিমান অবতরণ করলে, ফেডারেল এজেন্টরা তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য অপেক্ষা করছিল।
প্রায় এক মাস পরে লোয়ার ম্যানহাটনের একটি জেল থেকে ২০ মিনিটের একটি ফোন কলে এপস্টেইন শুলিয়াককে বলেন, তার বিরুদ্ধে মামলাটির নিষ্পত্তি হতে তার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগবে এবং এই সময়ের মধ্যে থাকার জন্য তাকে অন্য কোনো জায়গা খুঁজে নিতে পরামর্শ দেন। তিনি তাকে শক্ত থাকতে বলেছিলেন।
পরদিন সকালে, ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট এপস্টেইনকে কারাগারের সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়; তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তার মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে, তিনি তার উইল সংশোধন করে শুলিয়াককে তার প্রায় ৬০ কোটি ডলারের সম্পত্তির একটি বড় অংশ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে ৩৩ ক্যারেটের হীরার আংটিটিও ছিল, যা একটি হাতে লেখা নোটে ‘বিবাহের প্রত্যাশায়’ দেওয়া হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
শুলিয়াক ঠিক কত অর্থ পাবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। তার শিকারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পর, সম্পত্তির বর্তমান মূল্য ১২ থেকে ২০ কোটি ডলারের মধ্যে দাঁড়িয়েছে এবং আরও কয়েক ডজন সুবিধাভোগী রয়েছেন।