আইস হকির প্রজন্ম পড়েছে ফুটবল প্রেমে

শেষ বাঁশি বাজতেই মাঝমাঠে গোল হয়ে দাঁড়ালেন কানাডার ফুটবলাররা! কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের জল সামলানোর চেষ্টা করছেন! সেই বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোচ জেসি মার্শ বললেন, ‘তোমরাই কানাডার নায়ক। তোমাদের কারণেই এই দেশে ফুটবলের ভবিষ্যৎ বদলে যাবে।’

আইস হকির দেশ হিসেবে পরিচিত কানাডায় ফুটবল কখনোই মূলধারার খেলায় পরিণত হয়নি। বহু বছর ধরে জাতীয় দলের ম্যাচেও গ্যালারিতে কানাডিয়ান সমর্থকদের সংখ্যা থাকত হাতে গোনা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই চিত্র পাল্টে দিতে শুরু করেছে।

বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হয়েও কানাডা ছিল আলোচনার বাইরে। উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করেছে মেক্সিকো, ফাইনাল হবে যুক্তরাষ্ট্রে। আলোচনার প্রায় সবটুকুই ছিল এই দুই দেশকে ঘিরে। কানাডা যেন ছিল ‘ভুলে যাওয়া’ আয়োজক।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই টুর্নামেন্টে কানাডার রেকর্ড ছিল ছয় ম্যাচে ছয় হার। এবার প্রথম ম্যাচেই বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ঐতিহাসিক ড্র। এরপর কাতারকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে প্রথম বিশ্বকাপ জয়। আর গতরাতে নকআউটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যোগ করা সময়ে স্টিফেন ইউস্তাকিওর দুর্দান্ত গোলের পথ ধরে জন্ম নেয় ইতিহাস। এ জয়ে এবার প্রথম দল হিসেবে এবং বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিল কানাডা।

বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ইউরোপের হাজারো দর্শকের সামনে খেলা আলফোনসো ডেভিসও স্বীকার করেছেন, টরন্টোয় লাল-সাদা জার্সি পরা হাজারো কানাডিয়ান সমর্থক দেখে তার চোখে পানি চলে এসেছিল। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো এত কানাডিয়ানকে ফুটবল ম্যাচে দেখিনি। মুহূর্তটা আমাকে কাঁদিয়ে দিয়েছে।’

সমর্থকরাও অনুভব করছেন পরিবর্তন। একজন বলেন, ‘এখন আমরা ধীরে ধীরে ‘সকার’ নয়, ‘ফুটবল’ বলতে শুরু করেছি। কানাডা ফুটবল জাতিতে পরিণত হচ্ছে।’

জেসি মার্শ দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন, তিনি শুধু ম্যাচ জিততে চান না; তিনি একটি প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে ফেলতে চান। দুই বছর পর তার সেই স্বপ্ন বাস্তবের রূপ নিচ্ছে।

তার পথ ধরেই যেন গতকাল রাতে কানাডা জন্ম দিল আরেক বিস্ময়ের। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলো (রাউন্ড অব ১৬)-এ জায়গা করে নিয়েছে উত্তর আমেরিকার দেশটি। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে যোগ করা সময়ে স্টিফেন ইউস্তাকিওর দূরপাল্লার দুর্দান্ত গোলে আসে ঐতিহাসিক এই জয়।

এখন সামনে অপেক্ষা করছে নেদারল্যান্ডস অথবা মরক্কোর মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। শেষ ষোলোয় ওঠা কানাডা আগামী ৪ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গার লড়াইয়ে নামার আগেই জয় করে নিয়েছে সবার মন। কানাডার জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় জয় ইতোমধ্যেই এসে গেছে। কারণ এই বিশ্বকাপ তাদের শুধু শেষ ষোলোয় তোলেনি, বরং এমন এক দেশে ফুটবলের নতুন জোয়ার তুলেছে, যেখানে এতদিন বরফের ওপরের খেলাই ছিল মানুষের প্রথম ভালোবাসা!

এসএন/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *