ইসরায়েলে আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। দুর্নীতি মামলা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার কারণে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে থাকা নেতানিয়াহু তাঁর চার দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। খবর আল জাজিরার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় ও হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে। বর্তমানে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে উত্তর সীমান্তে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন চাচ্ছে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ হোক, যাতে ইরানের সঙ্গে হওয়া মার্কিন চুক্তি সুরক্ষিত থাকে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়। কিন্তু ইসরায়েলি জনগণ ইরান ও তার প্রক্সি বা সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। ফলে নেতানিয়াহু এখন আমেরিকার চাপ ও দেশের জনমতের মাঝখানে আটকা পড়েছেন।
তীব্র অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও তদন্তে অস্বীকৃতি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে ও পরে সরকারের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে একটি স্বাধীন গণতদন্ত কমিটি গঠনে অস্বীকৃতি জানানোয় ইসরায়েলের জনগণের বড় অংশ নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ। এছাড়া গাজায় চালানো ভয়াবহ যুদ্ধ ও এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের একঘরে ভাব এবং আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা নেতানিয়াহুর অবস্থানকে আরও নড়বড়ে করে দিয়েছে।
দুর্নীতির মামলা ও কারাদণ্ডের ঝুঁকি
২০১৯ সাল থেকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে যদি তিনি ক্ষমতা হারান এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাঁকে কারাগারেও যেতে হতে পারে।
লেবানন দখল ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ ও লেবাননের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার শর্ত রয়েছে। তবে ইসরায়েল এখনো লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে এবং হামলা অব্যাহত রেখেছে, যেখানে গত ২ মার্চের পর থেকে চার হাজার ২৩০ জন নিহত ও ১২ হাজার ১৭৯ জন আহত হয়েছেন। সম্প্রতি একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ইসরায়েলি লেবানন দখল করে রাখার পক্ষে, আর মাত্র ১০ শতাংশ এর বিপক্ষে।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের চাপ ও ট্রাম্পের অসন্তোষ
নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটনের কাছে লেবানন নিয়ে সঠিক কৌশল তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন নেতানিয়াহু। এমনকি লেবাননে হামলার জন্য ওয়াশিংটনের অনুমতির প্রয়োজন হওয়াটা ইসরায়েলের জন্য অকল্পনীয়।
অন্যদিকে মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডে বিরক্ত এবং একটি ফোনালাপে তাঁকে ‘পাগল’ বলেও অ্যাখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানতেই হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়নি, যা নেতানিয়াহুর জন্য বড় চিন্তার কারণ।