মালয়েশিয়া ও চীন সফরে ‘অভূতপূর্ব সাফল্যে’ সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য জাতীয় সংসদের ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

আজ শনিবার (২৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনে ১৬তম দিন ধন্যবাদ প্রস্তাব কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ আহমদ বীর বিক্রম।

বৈঠকের শুরুতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের গত ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

ধন্যবাদ প্রস্তাবটি পাসের জন্য স্পিকার কণ্ঠভোটে দেন। বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠন করার চার মাসের মাথায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে এবং অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তিনি এই সফরে অনেকগুলো চুক্তি সম্পাদন করেছেন। পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। সেই জন্যই আজ আমাদের নেতা যিনি ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করে ফেলেছেন। যেখানে বাংলাদেশের মানুষ তার সম্পর্কে ধারণা সৃষ্টি করেছে যে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করছেন। পুরনো সমস্ত খারাপ বাদ দিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন। গণচীনের সঙ্গে ১৭টি এমওইউ হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাইলেটারাল যে মিটিং হয়েছে সেই মিটিংয়ে এমওইউগুলো সই হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেছেন, সভা করেছেন, বৈঠক করেছেন এবং অত্যন্ত হৃদ্যতার সঙ্গে আলোচনাগুলো হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের যে সম্পর্ক এটা আরও দৃঢ় হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা তাদের ভূমিকা অক্ষুণ্ণ রাখবে শুধু নয়, তারা এটাকে আরও সম্প্রসারিত করবেন। আমাদের যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেসব সমস্যা তারা সমাধানের চেষ্টা করবেন। এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের ব্যাপারেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। সে ব্যাপারে তারা উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলেও জানিয়েছে। আমি সেই জন্য অনুরোধ করছি যে, আজকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সংসদ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হোক।

ধন্যবাদ প্রস্তাবটি সংসদের কাছে উত্থাপন করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিককালে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্পর্কিত যে প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সংসদে উত্থাপন করেছেন, সেটি সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব হিসেবে উত্থাপিত হলো। এরপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনা শুরু হয়।

আলোচনায় অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেবের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করে প্রথমেই বলতে চাই যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কালচারাল একটা পরিবর্তন আনার প্রয়োজন সেটা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন। উনি যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে হাজার লোকের সংবর্ধনা বা আসার সময়ও করে নাই। এটা কিন্তু একটা বিরাট কালচারাল চেঞ্জ বাংলাদেশের। অ্যান্ড প্রাইম মিনিস্টার ইজ সেটিং দ্য স্ট্যান্ডার্ড। হি ইজ সেটিং দ্য স্ট্যান্ডার্ড, আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি কী হবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, উনার যে ভ্রমণ মালয়েশিয়া ও চীনে, এই ভ্রমণের ভিত্তি ছিল আমাদের পররাষ্ট্রনীতির যে ভিত্তি তা— আমাদের সঙ্গে প্রত্যেকটি দেশের সম্পর্ক হবে অন মিউচুয়াল রেস্পেক্ট, অন মিউচুয়াল ইন্টারেস্ট, নন-ইন্টারফেয়ারেন্স এবং স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি, আমাদের নিজস্ব অটোনমির ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রীর এই ভিজিট সেটা প্রমাণ করেছে। আমাদের অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের যে বেঞ্চমার্ক, উনি সেটা আবার কনফার্ম করেছেন। যেটা বিএনপির রাজনীতিতে সবসময় ছিল, যেটা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব এস্টাবলিশ করেছিলেন, প্রত্যেকটি দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে এই মানদণ্ডের ওপর। আমরা কোথাও কম্প্রোমাইজ করব না। আমাদের সঙ্গে প্রত্যেকটি দেশের যে সম্ভাবনা আছে সেটা অর্থনৈতিক হোক, অন্য কোনো বিষয় হোক, সেই সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ কাজে লাগিয়ে, আমার ইন্টারেস্টে, আমার দেশের ইন্টারেস্টে, আমার জনগণের ইন্টারেস্টে কাজে লাগানোর জন্য আমরা মাল্টিলেটারালিজমের যে ফরেন পলিসি পারস্যু করেছি, বিএনপির রাজনীতি শুরু থেকে এখন পর্যন্ত, উনি সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।

আমির খসরু বলেন, মালয়েশিয়াতে আমাদের শ্রমবাজারের একটা বড় ইন্টারেস্ট রয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের এনার্জির একটা বড় ইন্টারেস্ট রয়েছে এবং অন্যান্য ট্রেড ইন্টারেস্ট রয়েছে, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন্টারেস্ট রয়েছে। চীনের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপারে আমাদের বিশাল ট্রেড, আমাদের সাথে একচুয়ালি দে আর দ্য লার্জেস্ট ট্রেড পার্টনার অফ বাংলাদেশ। এবং এটাকে আরও কীভাবে বাংলাদেশের পক্ষে, ট্রেড গ্যাপ যেটা আছে চীনের সঙ্গে, আমরা কীভাবে সেখানে রফতানি বাড়াতে পারি সেই ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। তো আমি মনে করি, এই ভিজিটে উনি যে একটা বেঞ্চমার্ক, যে মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, এটা আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু নয়, বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কী সম্পর্ক হবে সেটা নিশ্চিত করেছে।

বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, আমি তাকে সমর্থন করছি। এই দেশ আমাদের সবার, আমরা সকলেই স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির কথা বলে থাকি। আমরা সত্যিকার অর্থে একটা স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি দেখতে চাই, বাস্তবায়ন করতে চাই। এক্ষেত্রে বিরোধী দল হিসেবে আমাদের যেটুকু করণীয় আমরা সরকারকে আশ্বস্ত করছি যে, আমরা সকল সহযোগিতাই করব। সবকিছুর ওপরে, যে দুটি দেশ সফরের মধ্য দিয়ে তার সরকারি সফর শুরু হলো, দুটি দেশই আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং তারা পরীক্ষিত বন্ধু। তবে এটি ঠিক যে বাংলাদেশ একটা ইম্পোর্ট বেসড কান্ট্রি। আমাদের এক্সপোর্টের চেয়ে ইম্পোর্ট অনেক বেশি। ব্যবধানটা অনেক বড়। আমাদের এক্সপোর্টের মূল দুইটা হাত। একটা হচ্ছে রফতানি। আমরা যেটা আরএমজিতে করে থাকি। আরেকটা আমাদের ম্যানপাওয়ার। আমরা রফতানি বলি না, তাদেরকে আমরা পাঠিয়ে থাকি। এটাকে ডাইভার্সিফাই করার যথেষ্ট সুযোগ আমাদের রয়েছে। তার জন্য দরকার শর্ট, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী প্লান। তিনি বলেন, আমি আশা করি যে প্রধানমন্ত্রী তার সফরে এই বিষয়গুলা মাথায় রেখেই দুইটি দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন।

বিরোধী দলীয় নেতা আরও বলেন, যেহেতু আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে আছি। খুবই ভালো হয় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার স্বার্থে জনগণের স্বার্থে বিদেশের সঙ্গে যতগুলা মৌলিক চুক্তি সম্পাদিত হবে সেগুলোই সংসদে নিয়ে আসা। এই সংসদ কিন্তু ১৮ কোটি মানুষ বা ২০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে। তারা যখন জানবেন তখন এর মধ্য দিয়ে সরকার এবং জনগণের সেতুবন্ধন তৈরি হবে। এটা আমরা সবাই বলি। সবাই চাই যে আমাদের রিলেশন হবে মিউচুয়াল রেসপেক্ট এবং ইকুইটির ভিত্তিতে। আমি আশা করি তিনি সেই সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। আমি এও আশা করি যে আমাদের স্বাধীন, ফরেন পলিসিতে কেউ হস্তক্ষেপ করুক— এটা আমরা কখনও মেনে নেব না। দেশের স্বার্থ আগে। তারপর অবভিয়াসলি কারও সঙ্গে আমাদের চুক্তি, এমওইউ যাই হোক সেটা হবে মিউচুয়াল ইন্টারেস্টের ভিত্তিতে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না। কিন্তু আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না। এই ভারসাম্যটা রক্ষা করেই আগামীর পলিসি যেন পরিচালিত হয়।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি এবং তার সরকারের সফলতাও কামনা করছি। সংসদ যেন সকল কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়। সংসদকে বাইপাস করে যেন কিছুই না হয়, সবকিছু হোক সংসদের ভেতরে। এই সংসদ আলো ছড়াক, আগামী দিনের জনগণ সরকারি দল, বিরোধী দল সকলের কার্যক্রমকে তাদের একাউন্টে নিয়েই তাদের সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে সরকারি দল সকল ক্রেডিট নেবে, আর বিরোধী দল সবকিছুতে বিরোধিতা করবে, আমরা ব্যক্তিগতভাবে এবং দলগতভাবে আমরা এই কালচার সমর্থন করি না। সরকারি দলকেও বিরোধী দলকে সম্মান করতে হবে। আর বিরোধী দলেরও দায়িত্ব থাকবে দেশ গঠনে তার জায়গা থেকে যথাযথ ভূমিকা রাখা। সবাইকে ধন্যবাদ। আমি এই প্রস্তাবকে আবারও সমর্থন দিয়ে আপাতত শেষ করলাম।

এ সময় স্পিকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য ধন্যবাদ জানান। এরপর কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *