মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের আলোচনা ‘খুব ভালো ভিত্তি’ তৈরি করেছে। দেশটির পাহাড়-চূড়ায় একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে দীর্ঘ সময়ের সরাসরি আলোচনার পর জেডি ভ্যান্স এই মন্তব্য করলেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স জানান, তেহরান জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার পরিদর্শকদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। এক বছর আগে ইরান এ বিষয়ে বেশকিছু সহযোগিতা স্থগিত করেছিল এবং ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ করা প্রধান পারমাণবিক সাইটগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল।
গত সপ্তাহে প্রায় ৪০ দিনের লড়াই এবং তার পরে কয়েক সপ্তাহের অনির্দিষ্ট ও প্রায়শই লঙ্ঘিত যুদ্ধবিরতির পর, তেহরান এবং ওয়াশিংটন আলোচনার ভিত্তি তৈরি করতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল বুর্গেনস্টক রিসোর্টে সাংবাদিকদের জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আমরা খুব ভালো ভিত্তি স্থাপন করেছি। চূড়ান্ত চুক্তিটি হলো একটি বাড়ি… আমরা এখনও বাড়িটি তৈরি করিনি, তবে মার্কিন জনগণের জন্য একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য আমরা একটি সফল ভিত্তি স্থাপন করেছি।’
আলোচকদের লক্ষ্য হলো কয়েক দশক ধরে মার্কিন-ইরান সম্পর্ককে জর্জরিত করা কিছু অত্যন্ত জটিল সমস্যার সমাধান করা, যার মধ্যে রয়েছে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং আরও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের মতো বিষয়গুলো।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আজ সোমবার বলেছেন, পারমাণবিক বিষয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে, তবে বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি এবং পারমাণবিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।
জেডি ভ্যান্স বলেছেন, তেহরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের ‘তাদের দেশে ফিরে আসার’ আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে। একে তিনি একটি বড় মাইলফলক এবং ইরানকে স্থায়ীভাবে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে রোডম্যাপ
মার্কিন-ইরান আলোচনার আগের দিনগুলোতে, ইসরায়েল ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননে চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছিল, যদিও গতকাল রোববার থেকে দেশটি তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে।
ইসরায়েলি নেতারা গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে তাদের সৈন্যরা দক্ষিণ লেবাননের দখল অব্যাহত রাখবে এবং সেখানে যেকোনো হুমকির জবাব দিতে তারা স্বাধীন।
এদিকে মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, লেবাননে লড়াই বন্ধ করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে তেহরান ও ওয়াশিংটন যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই প্রণালিটি বন্ধ করে দিয়েছিল, যা দিয়ে শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই বন্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছিল।
সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এই প্রণালি দিয়ে অবাধ আন্তর্জাতিক যাতায়াত ছিল, তবে তেহরান যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে এই জলপথ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করতে আগ্রহী বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ইরান কিছু নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই পেতে যাচ্ছে, যার ফলে তাদের কিছু অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা হবে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার জানিয়েছে, আলোচকরা ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপ-এর বিষয়ে একমত হয়েছেন এবং সুইজারল্যান্ডের রিসোর্টে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে প্রযুক্তিগত আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
তারা আরও জানান, যুদ্ধ যাতে আবার ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এবং লেবাননের কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি ‘সংঘাত নিরসন সেল’ গঠনেও সম্মতি হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, ‘পাকিস্তান ও কাতারের নিরলস মধ্যস্থতা লেবানন যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি এনেছে।’
আব্বাস আরাঘচি আরও লেখেন, ‘তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে, অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে, কিছু অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আসল পরীক্ষা হলো লেবানন সংঘাত নিরসন সেলের তৎপরতা।’