রাজধানীর বংশালে মোখলেছিন হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ সোমবার (২২ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার এ আদেশ দেন।
এর আগে গত ১৮ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফ হোসেন মোখলেছিন হত্যাচেষ্টা মামলায় ইনু ও রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। এদিন শুনানিকালে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের হাজতখানা থেকে হাতে হ্যান্ডকাপ, মাথায় হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পড়িয়ে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে তাদের এজলাসে তোলা হয়। রাখা হয় আসামির কাঠগড়ায়। তাদের কেন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে আদালতকে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর মেনন ও ইনুর আইনজীবীরা দাবি করেন, তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। বয়স্ক, অসুস্থ বিবেচনায় তাদের গ্রেপ্তার না দেখানোর প্রার্থনা করেন তারা।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ আসামিদের গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর তারা। হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করার সবই করেছিলেন। তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী, এমপিও ছিলেন। এমন কোনো অন্যায় নেই যে করেননি। তাদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রার্থনা করছি।’
এর পরই বিচার ও প্রশাসনের কে কি করছে তা লাল-সবুজ খাতায় লিখে রাখছেন বলে বিচারকের উদ্দেশে হুমকিস্বরূপ এ কথা বলেন হাসানুল হক ইনু। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চান তিনি।
আদালত অনুমতি দিলে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পর তদন্ত কর্মকর্তা আবিষ্কার করলেন, আমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আমাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করলেন।’ তদন্ত কর্মকর্তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ইনু বলেন, ‘তিনি তার দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। এতদিনেও মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেননি।’
এ সময় দুঃখ প্রকাশ করে ইনু বলেন, ‘আমি সংকটাপন্ন হৃদরোগের রোগী। আমার ডায়াবেটিসও রয়েছে। সকালে আমাদের নিয়ে আসা হয়। সাড়ে চার ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। এতে আমি আমার জীবন বিপন্নের আশঙ্কা করছি। যেকোনো সময় বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’ আদালতের অবহেলার কারণে এত দীর্ঘ সময় হাজতখানায় বসে থাকতে হয়েছে।
এ সময় ইনুর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ। তাকে ধমক দিয়ে ইনু বলেন, ‘আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলছি। আপনার সঙ্গে না।’ পরবর্তীতে বিচারক দুজনকেই শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারপর আবার কথা বলা শুরু করেন ইনু।
হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘ড. ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে বলেছিল, গণতন্ত্রের সুবাতাস বইছে। সেই সুবাতাস কি আদালত পাড়ায় আসেনি। আদালত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা শাখা হিসেবে কাজ করছে। আপনার মাধ্যমে (বিচারক) প্রধানমন্ত্রীকে বলব, তিনি অনেক জায়গায় গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আদালত পাড়ায় এখনও গণতন্ত্র আসেনি।’
হাসানুল হক ইনুর এমন বক্তব্যে আপত্তি তোলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তাকে ধমকের সুরে ইনু বলেন, ‘আমি তো আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলছি। আপনার সঙ্গে বলছি না। একপর্যায়ে ইনু বলেন, ‘আমি যেখানে আছি, জেলখানায় আছি। একটা সবুজ খাতা ও একটা লাল খাতা তৈরি করেছি। সেখানে আমি ২২ মাস ধরে আদালতের কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী কী করছে, প্রশাসনের কে কি করেছে, কোন কর্তৃপক্ষ কী করছে তা লিপিবদ্ধ করেছি। আদালত আমাদের সাড়ে চার ঘণ্টা হাজতখানায় বসিয়ে রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি করেছে। আমার জীবন বিপন্ন করেছে। অনেক ধন্যবাদ, আমার বক্তব্য ধৈর্য ধরে শোনার জন্য।’
ইনুর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান আইনজীবী হারুন অর রশীদ। তিনি আদালতকে বলেন, ‘তার (ইনু) এ বক্তব্য আদালত অবমাননার শামিল। লাল খাতা ও সবুজ খাতার কথা বলে আদালতকে হুমকি দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রার্থনা প্রার্থনা করছি।’
উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত আসামি দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
নথি থেকে জানা যায় , জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট সকাল ১০টার দিকে বংশাল থানার নাজিম উদ্দিন রোড এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং গুলিবর্ষণ করা হয়। গুলিবিদ্ধ হন মোখলেছিন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে পরে মামলা দায়ের করেন তিনি।