তিন অঙ্গনের নায়ক আব্দুস সাদেক আর নেই

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম আব্দুস সাদেক। দেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক, আবাহনীর প্রথম ফুটবল অধিনায়ক, সফল কোচ এবং দূরদর্শী ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। সেই কিংবদন্তি ক্রীড়াসৈনিক আর নেই। শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই বরেণ্য ক্রীড়াবিদ। তার মৃত্যুতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন এই কিংবদন্তি।

আবদুস সাদেকের ছোট ভাই শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। মরহুমের বড় ছেলে টি স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইশতিয়াক সাদেক।

আব্দুস সাদেকের নাম উচ্চারিত হলেই বাংলাদেশের হকির শুরুর দিনের ইতিহাস সামনে চলে আসে। স্বাধীনতার আগে তিনি পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান দলের সদস্য হিসেবে ইউরোপ সফরে অংশ নেন তিনি। প্রায় দেড় মাসের সেই সফরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে খেলার সুযোগ হয় তাঁর। ফেরার পথে মিসরের বিপক্ষেও মাঠে নামেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার দক্ষতা ও নৈপুণ্য তখনই প্রশংসা কুড়ায়।

স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্রীড়া পরিচয় গড়ে তোলার যে প্রয়াস শুরু হয়, তার অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন আব্দুস সাদেক। ১৯৭৩ সালে জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে দেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৭৮ সালে ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে অংশ নেয় বাংলাদেশ হকি দল। আন্তর্জাতিক হকি অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রথম বড় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সেই স্মরণীয় যাত্রার নেতৃত্বে ছিলেন সাদেক, যা দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে।

তবে আব্দুস সাদেকের পরিচয় শুধু হকির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ফুটবল ও ক্রিকেটেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। হকি, ফুটবল, ক্রিকেট তিন অঙ্গনেই ছিল তার সরব উপস্থিতি! ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রথম ফুটবল অধিনায়ক হিসেবে ক্লাবটির ইতিহাসের সঙ্গে তার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি কোচ হিসেবেও নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

১৯৭২ সালে শক্তিশালী দল হিসেবে পথচলা শুরু হয় আবাহনী ক্রীড়াচক্রের। ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল দলে নেন সাদেককে। স্বাধীনতার আগে ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশার মতো জনপ্রিয় ক্লাবে খেলেন তিনি। শেখ কামাল ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলের নেতৃত্বের ভার তুলে দেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আব্দুস সাদেকের হাতে। এরপর হকিতে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয় আবাহনী।

১৯৭৭ সালে আবাহনীর প্রধান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণের পরই গড়েন অনন্য এক রেকর্ড। তার অধীনে ওই মৌসুমে আবাহনী কোনো ম্যাচে হারেনি। মাত্র তিনটি ম্যাচ ড্র করে বাকি সবগুলোতে জয় পায় দলটি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম ক্লাব হিসেবে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে আবাহনী। স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো দলের প্রথম অপরাজিত লিগ শিরোপা জয়ও ছিল সেটি।

খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে সফলতার পর ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আব্দুস সাদেক। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া কাপ হকি, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া আয়োজনে একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশের হকির বিকাশে তার অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

ক্রীড়ার প্রতি তার ভালোবাসার শিকড় ছিল পারিবারিক পরিমণ্ডলে। তার বাবা অ্যাডভোকেট আব্দুস সোবহান ব্রিটিশ আমলের একজন খ্যাতিমান সাঁতারু ছিলেন। সেই ক্রীড়া ঐতিহ্য থেকেই আব্দুস সাদেকের বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীতে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া।

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন। হকি, ফুটবল, কোচিং ও ক্রীড়া প্রশাসন-প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন সাফল্যের স্বাক্ষর। তার জীবন কেবল একজন খেলোয়াড়ের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসও।

মরহুমের প্রথম জানাজা আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে।

এসএন/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *