ইউক্রেন আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) কয়েক বছরের মধ্যে মস্কোয় তাদের বৃহত্তম ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরে গেছে, একটি প্রধান তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের বৃহত্তম বিমানবন্দর থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
রাশিয়া এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। হামলার ফলে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর দক্ষিণের আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং আকাশ থেকে কালির সাথে মিশ্রিত কালো বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার মতো ঘটনা দেখা গেছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন এবং একটি শপিং মল ও আবাসিক ভবনে আগুন লেগে গেছে।
মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহর কাজানে যখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করছিলেন, ঠিক তখনই এই হামলাটি চালানো হয়। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন দিনভর সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিবৃতি দিলেও, এই হামলার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ অঙ্গীকার করেছেন যে, মস্কো ইউক্রেনে নিজস্ব হামলার মাধ্যমে এর প্রতিশোধ নেবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, কিয়েভে চালানো প্রাণঘাতী হামলার এটি একটি সম্পূর্ণ ‘ন্যায্য প্রতিক্রিয়া’। ইউক্রেনের রাজধানীতে এই সপ্তাহের শুরুতে চালানো ওই রুশ হামলায় একটি ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রাল এবং ইউনেস্কো-সুরক্ষিত ১১ শতকের একটি মঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলেনস্কি বলেন, তিনি চান রুশ জনগণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের এই সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতের পরিণতির জন্য পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক।
সাংবাদিকদের জেলেনস্কি বলেন, ‘প্রধান বিষয় হলো রাশিয়ার মানুষ যেন বুঝতে শুরু করে যে, পুতিন নামের একজন মানুষই এই যুদ্ধ চালাচ্ছেন, আর সাধারণ মানুষকে সবকিছুর মূল্য দিতে হচ্ছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইউক্রেন যদি পুড়ে, তবে আপনাদের মস্কোও পুড়বে।’
হামলার কারণে মস্কোর বিমানবন্দরগুলো কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ ছিল, যার ফলে শত শত ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়।
রাশিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর শেরেমিয়েতেভো এক ঘোষণায় জানায়, ড্রোন হামলার সময় তারা যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিল এবং বেলা ১১টার দিকে এটি পুনরায় চালু করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব কাপোতনিয়া জেলায় শোধনাগারের কাছে হাঁটতে থাকা কনস্ট্যান্টিন এএফপি-কে বলেন, তিনি এর আগে কখনো এমন কিছু দেখেননি। ভ্যালেন্টিনা নামের ২৯ বছর বয়সী এক ম্যানেজার জানান, বিকট শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। পেছনে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী রেখে মেয়ের সঙ্গে পার্কে হাঁটার সময় তিনি বলেন, ‘এটি সত্যিই খুব ভয়ানক।’
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন বলেছেন, কয়েকটি ড্রোন মস্কো তেল শোধনাগারে পৌঁছেছে, তবে স্থাপনাটির ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ তিনি দেননি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আশেপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
আরেকটি ড্রোন একটি আবাসিক ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে, অন্যদিকে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের কারণে রাজধানীর শহরতলীর কাছে একটি শপিং মলে আগুন লেগে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের ওপরের তলাগুলো থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে এবং ক্যামেরার পেছনে এক নারীকে আতঙ্কে কাঁদতে শোনা গেছে।
মস্কোর মেয়র সোবিয়ানিন জানান, মস্কোর দিকে ধেয়ে আসার সময় রুশ বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রায় ১৮০টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা রাতভর পুরো দেশজুড়ে ৫০০-রও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিয়েভ রাশিয়ায় তাদের ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। মস্কোর যুদ্ধের তহবিলে অর্থ যোগানো তেল শোধনাগারগুলোকে এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে। মস্কোর তেল শোধনাগারে এটি এই সপ্তাহে দ্বিতীয় ইউক্রেনীয় হামলা।
এদিকে, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা এখন প্রায় স্থবির হয়ে রয়েছে। হামলার পর জেলেনস্কি বলেন, ‘এখন যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে এবং রাশিয়াকে কূটনীতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার শেষ রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যে রাশিয়াও ইউক্রেনে ২০০-রও বেশি ড্রোন এবং একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।