ম্যাচ শেষে ডালাস স্টেডিয়াম ছাড়ার সময় হ্যারি কেইনের বাঁ পায়ে ছিল ব্যান্ডেজ। তবে মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। পাশে স্ত্রী কেটি গুডল্যান্ড, আর সেই মুহূর্তের ছবিতে ফুটে উঠছিল এক সফল রাতের গল্প। ক্রোয়েশিয়ার এক কঠিন ট্যাকলে শেষ দিকে সামান্য চোট পেলেও ইংল্যান্ড অধিনায়কের মুখভঙ্গি বলছিল, উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। কারণ মাঠে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা ইংল্যান্ড সমর্থকদের জন্য ছিল স্বস্তি, আনন্দ আর আশার এক বিরল মিশেল।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গত রাতে ৪-২ গোলের জয়ে জোড়া গোল করেছেন কেইন। কিন্তু এই রাতকে শুধুমাত্র দুটি গোলের রাত বললে ভুল হবে। এটি ছিল এমন এক রাত, যখন ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সঙ্গে নিজের নামকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেললেন তিনি। এমন এক রাতে, যখন একটি নয়, দুটি বিশেষ মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় উঠে এসেছেন গ্যারি লিনেকারের পাশে। দুজনের গোলসংখ্যাই এখন ১০। ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে আর কোনো ফুটবলার এই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেননি। তাই ক্রোয়েশিয়ার জালে কেইনের দ্বিতীয় গোলের পর ইংল্যান্ড কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের উদ্যাপনও ছিল প্রতীকী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, লাল জার্সি পরে ম্যাচ দেখছিলেন তিনি। গোল হতেই দুই হাতের দশটি আঙুল তুলে ধরেন। যেন নীরব ভাষায় জানিয়ে দেন-এখন তিনি আর একা নন, পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কেইন।
এই সমতায়ও রয়েছে নানা কৌতূহলোদ্দীপক মিল। দুজনই স্ট্রাইকার, দুজনই ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের ভরসা ছিলেন নিজ নিজ সময়ে। দুজনেরই ক্যারিয়ারে রয়েছে টটেনহামের অধ্যায়। এমনকি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে দেওয়া গোল্ডেন বুটও জিতেছেন দুজনই। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে লিনেকার ছয় গোল করে পেয়েছিলেন সেই স্বীকৃতি। তিন দশকেরও বেশি সময় পর ২০১৮ বিশ্বকাপে একই সংখ্যক গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন কেইন।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বকাপে ১০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে দুজনেরই লেগেছে ১২টি ম্যাচ। পরিসংখ্যানের এই অদ্ভুত মিল যেন দুই প্রজন্মের দুই কিংবদন্তিকে একই ফ্রেমে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে বাস্তবতা বলছে, এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ লিনেকারের যাত্রা সেখানে শেষ হলেও কেইনের পথ এখনও অনেক দূর।
ক্লাব ফুটবলে গত মৌসুমে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করা এই স্ট্রাইকার যে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই। তাই লিনেকারকে ছাড়িয়ে যাওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছেন অনেকেই। মজার ব্যাপার হলো, এই সম্ভাবনায় সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা হয়তো লিনেকারেরই। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনি বলেছিলেন, তিনি চান কেইন তাঁকে ছাড়িয়ে যান। কারণ সেটি ঘটলে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনাও বাড়বে।
তবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কেইনের গল্প শুধু গোলের নয়, ভুল থেকে শেখারও। ম্যাচের ১২ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি প্রথম চেষ্টায় খুব একটা ভালোভাবে নিতে পারেননি তিনি। শট ছিল দুর্বল। কিন্তু গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ শট নেওয়ার আগেই গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসায় পেনাল্টিটি পুনরায় নেওয়ার সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়বার আর কোনো ভুল করেননি কেইন। শক্তিশালী ও নিখুঁত শটে বল জড়িয়ে দেন জালে।
সেই গোলটি আবার তাকে পৌঁছে দেয় আরেকটি রেকর্ডের সামনে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন কেইন। টাইব্রেকারের হিসাব বাদ দিলে বিশ্বকাপে তিনি ছয়টি পেনাল্টি নিয়েছেন, যার পাঁচটিতেই গোল করেছেন। একটি শট বাইরে গেলেও পাঁচ গোলের এই অর্জন তাঁকে সবার ওপরে নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক বড় বড় তারকা পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন। পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিও, নেদারল্যান্ডসের রব রেনসেব্রিঙ্ক কিংবা আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা চারটি করে পেনাল্টির সবগুলোতেই সফল ছিলেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো চারটির মধ্যে তিনটিতে গোল পেয়েছেন। অন্যদিকে ঘানার আসামোয়া জিয়ানের গল্পে আছে আক্ষেপ-চার পেনাল্টির একটিতে বল লেগেছে পোস্টে, আরেকটি ক্রসবারে।
কিন্তু এই মুহূর্তে আলোটা পুরোপুরি কেইনের ওপরই। কারণ তিনি শুধু গোল করছেন না, ইতিহাসও লিখছেন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ইংল্যান্ডের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু কেন তাকে ঘিরেই!
এসএন/কে