পদ্মা ব্যারেজসহ পানিনিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু সহনশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে পানিনিরাপত্তাকে। নদী পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খাল খনন এবং বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে পানি সম্পদ খাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বরাদ্দের ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে দেশের নদী, সেচব্যবস্থা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

প্রতিটি বিভাগে নদী দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার অংশ হিসেবে প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলমান সাতটি প্রকল্পের আওতায় ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মোগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী ও বড়নাই – এই আটটি নদী থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনা

তথ্যনির্ভর শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার অংশ হিসেবে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর জন্য ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’(ডব্লিউকিউআই) বা পানির গুণগত মান সূচক প্রণয়ন করেছে সরকার। এর মাধ্যমে নদীর স্বাস্থ্য আরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপ লার্নিংভিত্তিক ভূগর্ভস্থ পানির রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য পাওয়া যাবে, যা পানি সংরক্ষণ ও টেকসই উত্তোলন বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এসব প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ব্যাপক খাল খনন কর্মসূচি

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ‘নদী, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’শীর্ষক একটি জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।এ উদ্যোগটি আগামী পাঁচ বছরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও ড্রেনেজ চ্যানেল খননের বৃহত্তর সরকারি লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত।

শুধু ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই ৬৮০ কিলোমিটার খাল, সেচখাল ও নিষ্কাশন খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া ‘বাংলাদেশের খাল শনাক্তকরণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং জিও-ইনফরমেটিক্স ডেটাবেজ উন্নয়ন’নামে একটি বড় প্রকল্পের আওতায় দেশের সব খালের মানচিত্র তৈরি করা হবে এবং জিআইএসভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক ডাটাবেজ গড়ে তোলা হবে। এর ফলে দেশের জলপথের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তালিকা তৈরি হবে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নৌপথের উন্নয়ন

আগামী অর্থবছরে ব্যাপক বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৩০৯ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪৮৪ কিলোমিটার নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি এবং ডুবোচর অপসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের চলমান ‘বন্যা সুরক্ষায় ১৮০ দিনের কর্মসূচি’র আওতায় ইতোমধ্যে ২৯২ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও পুনর্বাসনের কাজ চলছে। এসব উদ্যোগ মৌসুমি বন্যার ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি পানি প্রবাহ ও নৌপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

sn/sks

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *