মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে প্রকাশ হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) একটি ফাঁস হওয়া সংস্করণের তীব্র সমালোচনা করেছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ তেহরানের আলোচক দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে এই প্রতিবেদনটিকে ‘ভুল’ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। খবর আল জাজিরার।
সংবাদ সংস্থাটির দাবি, ব্লুমবার্গের উপস্থাপিত খসড়ায় হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি সংক্রান্ত ধারাগুলো বিশেষভাবে ‘ভুল’ এবং সেখানে বেশ কয়েকটি মূল শব্দ পুরোপুরি অনুপস্থিত রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই নিয়ে যেকোনো জল্পনা-কালের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মূল স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পরই কেবল সঠিক ও প্রকৃত খসড়া জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে জানা গেছে, গত রোববার (১৪ জুন) ডিজিটালভাবে এই সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। খসড়া অনুযায়ী, এতে তেহরানের জন্য ব্যাপক অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য (যেমন: সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি) নিয়ে কোনো তাৎক্ষণিক বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
ফাঁস হওয়া চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি দিক নিচে তুলে ধরা হলো :
১. যুদ্ধের স্থায়ী অবসান
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী অবসানে সম্মত হয়েছে।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান
উভয় পক্ষ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যৌথ অঙ্গীকার করেছে।
৩. চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করবে এবং প্রয়োজন হলে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবে।
৪. মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার
যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ
ইরান হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত অবরোধ ও সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা তুলে নিতে সম্মত হয়েছে।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিল
ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে, যা ৬০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে।
৭. সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আইএইএ ও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা (প্রাথমিক ও গৌণ) সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর অঙ্গীকার
ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার কোনো শর্ত এতে নেই, এটি চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
৯. স্থিতাবস্থা বজায় রাখা
আগামী ৬০ দিনে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি আর এগিয়ে নেবে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতিও বৃদ্ধি করবে না।
১০. তেল রপ্তানি ও ব্যাংকিং সেবায় ছাড়
যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড় দেবে। এর আওতায় ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
১১. জব্দকৃত অর্থ ছাড়
আগামী ৬০ দিনের আলোচনার অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরান তার জব্দকৃত বা স্থগিত তহবিলে প্রবেশাধিকার বা সুবিধা পাবে।
১২. তদারকি ব্যবস্থা গঠন
চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ও সফল তদারকির জন্য একটি কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
১৩. আলোচনার কাঠামো অব্যাহত রাখা
চুক্তির ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনার কাঠামো অব্যাহত রাখবে।
১৪. জাতিসংঘের অনুমোদন
চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
তবে এখনও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত পাঠ প্রকাশ না হওয়ায়, খসড়ায় থাকা সব বিষয় শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।