যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে কী ভাবছে ইরানের বিভিন্ন গোষ্ঠী?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পথটি ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং আঁকাবাঁকা। গত রোববার (১৪ জুন) একটি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণার অর্থ এই নয় যে, এখন থেকে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে; এমনকি আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পিত অনুষ্ঠানের পরেও। ইরানে গোষ্ঠীগত বিভেদ এখনও প্রবলভাবে রয়ে গেছে এবং আগামী মাসগুলোতে চুক্তি বাস্তবায়নের ধাপে ধাপে সেগুলো প্রকাশ্যে আসার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান যাতে কোনোভাবেই ‘আত্মসমর্পণ’ না করে, সে বিষয়ে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বিভিন্ন গোষ্ঠী কী ভাবছে এবং তাদের অবস্থান কী, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো :

মোজতবা খামেনি (সর্বোচ্চ নেতা)

তিনি তার শক্তিশালী নিহত পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তার নামে প্রকাশিত লিখিত বিবৃতি ছাড়া তাকে এখনো প্রকাশ্যে দেখা বা শোনা যায়নি এবং চুক্তি নিয়ে তিনি কোনো সরাসরি অবস্থান নেননি।

তার লিখিত বিবৃতিগুলোতে প্রধানত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে রক্ষা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই হস্তান্তরযোগ্য নয়।

গণমাধ্যমের ব্যাখ্যা

অতি-রক্ষণশীল পত্রিকা ‘কিহান’ এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ইচ্ছাকৃতভাবে পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো উল্লেখ করেননি। এটি ইঙ্গিত করতে পারে যে ইরান মনে করে পারমাণবিক ফাইলটি ‘শেষ’ হয়ে গেছে এবং এটি পুনরায় খোলার প্রয়োজন নেই। কিহান হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছে, ‘আমরা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ইতিহাসের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে আছি, তাই এখানে দুর্বলতা বা ভুলের কোনো অবকাশ নেই এবং সর্বোচ্চ নেতার রেড লাইনকে ক্ষুণ্ণ করার বা অতিক্রম করার অধিকার কারও নেই।’

আইআরজিসি ও নিরাপত্তা সংস্থা

যুদ্ধের সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হলেও, বেঁচে থাকা কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

আইআরজিসি প্রধান আহমদ ভাহিদির মতো জেনারেলরা প্রয়োজনে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতির কথা বারবার জানালেও চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে তারা স্পষ্ট করেছেন, তেহরান তার মিত্রদের, বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহকে কোনোভাবেই পরিত্যাগ করবে না এবং ইসরায়েল থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য যেকোনো চুক্তিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন.

কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি দীর্ঘ সময় পর জনসমক্ষে এসে বলেছেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) এবং প্রতিরোধের সন্তানদের হাতে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন আলোচনার দলের নেতৃত্বদানকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবফকে স্পষ্ট সমর্থন জানান।

বর্তমান সংসদ স্পিকার গালিবফ (সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার) এই চুক্তিকে সমর্থন করেছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ ‘ধ্বংস’ করা সম্ভব নয়, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য থাকলে তাদের সঙ্গে একটি লাভজনক চুক্তি সম্ভব। এছাড়া সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সচিব আইআরজিসি জেনারেল মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর পিছু না হটার কথা বললেও তাদের পরিষদ শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি অনুমোদন করেছে।

কট্টরপন্থিদের মতামত

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কট্টরপন্থিরা, কারণ ট্রাম্পই সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং ২০২০ সালে কুদস ফোর্সের নেতা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন।

তারা বিশ্বাস করে যে, পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে শুল্ক ব্যবস্থা আরোপ করতে হবে এবং অবশেষে এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনাদের সম্পূর্ণ বহিষ্কার করতে হবে।

ইরানের সংসদের কট্টরপন্থি সদস্য এবং সাঈদ জলিলির নেতৃত্বাধীন পায়দারি ফ্রন্ট এই শিবিরের প্রধান অংশ। পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনার ব্যর্থ ইতিহাস থাকা সাঈদ জলিলিকে এই চুক্তির অন্যতম প্রধান বিরোধী মনে করা হয়। এছাড়া কেইহান, তাসনিম, ফার্স ও মেহরের মতো আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর সম্পাদকীয় নীতি বজায় রেখেছে।

সরকার ও সংস্কারপন্থিদের মতামত

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতা কট্টরপন্থিদের কারণে কিছুটা হ্রাস পেলেও, তুলনামূলক মধ্যপন্থি পেজেশকিয়ান এখনও আইনত এসএনএসসি -এর প্রধান। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বর্তমান ক্ষতিকর ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ অবস্থার অবসান ঘটানো জরুরি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এমন একটি সমঝোতামূলক সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছেন যা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করবে।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, মোহাম্মদ খাতামি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ শুরু থেকেই এই আলোচনার পক্ষে ছিলেন। তারা মনে করেন, দেশকে বড় কোনো পতন থেকে রক্ষা করতে ও দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে আমেরিকার সঙ্গে এই শান্তি চুক্তি করা দরকার।

চুক্তি ঘোষণার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি খাতামি দেশের সবার উদ্দেশে বলেন, এখনই সময় দেশের সাধারণ মানুষ—যারা এই শাসনব্যবস্থার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে, সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। আমাদের উচিত এই আলোচনা ও আলোচকদের সমর্থন করা। এর মাধ্যমেই আমরা একটি স্থায়ী চুক্তি, স্থায়ী শান্তি এবং ভয় ও যুদ্ধমুক্ত জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *