ফ্রান্সে ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজের যৌথ আহ্বান, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি

চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান থেকে সরে না আসতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। শুক্রবার (১২ জুন) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই আহ্বান জানানো হয়।

ওই বৈঠকে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দুই পক্ষের প্রায় ২৫০ জন সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি অংশ নেন। ফ্রান্স এই উদ্যোগকে সামনে আনে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও শান্তি প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখার উদ্দেশ্যে।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘আমরা পৃথিবীতে যুদ্ধ থেকে সরে আসার হাজারো কারণ খুঁজে পেতে পারি। কিন্তু আপনারা এখানে আছেন, আপনাদের উপস্থিতিই আশা ও পদক্ষেপের ভিত্তি।’ তিনি আরও বলেন, ফ্রান্স যুদ্ধের পক্ষ নয়, বরং শান্তির পক্ষে অবস্থান বজায় রাখতে চায়।

এই বৈঠকের মাধ্যমে একটি আট দফা ‘কল ফর অ্যাকশন’ বা কার্যকর পদক্ষেপের প্রস্তাব গৃহীত হয়, যেখানে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ, গাজা পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শক্তিশালী সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই আহ্বানটি আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সের আল্পস অঞ্চলে অনুষ্ঠিতব্য জি-৭ সম্মেলনে নেতাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলমান থাকলেও কূটনৈতিকভাবে দুই রাষ্ট্র সমাধানের ধারণা আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

গাজায় হত্যাযজ্ঞ চলছেই

এদিকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে প্রতিদিনই নৃসংশতা চালিয়ে যাচ্ছি ইসরাইলি বাহিনী। এবার এক রাতেই ১৩ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করল তারা। এই নিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১ হাজারের বেশি মানুষ। যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙে গাজার সিংহভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে ইসরাইল।

কথিত যুদ্ধবিরতির আড়ালে গাজায় ইসরাইলি হামলা এখন নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা। সম্প্রতি আল-মাওয়াসি বাস্তুচ্যুত্য শিবিরে নিজ তাঁবুর সামনে সকালের কফি খাওয়ার সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান এক ফিলিস্তিনি।

ইসরাইল তাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য দাবি করলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মানবিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত ওই জনাকীর্ণ ক্যাম্পে কোনো সামরিক তৎপরতাই ছিল না। একই দিনে দেইর আল-বালাহতে এক কিশোরসহ বেশ কয়েকজন জেলে এবং নুসাইরাতের কাছে আরও কয়েকজন নৌবাহিনীর সদস্যকে আকাশ থেকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরাইলি সেনাদের গাজা থেকে ধাপে ধাপে পিছু হটার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা ভূখণ্ডটির আরও গভীরে জেঁকে বসছে। তথাকথিত ইয়েলো লাইন বা বিভাজন রেখা সম্প্রসারণ করে এরইমধ্যে গাজার অর্ধেকেরও বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে নেতানিয়াহু সরকার।

এমনকি আরও বাড়াতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, গাজার লাখ লাখ বাসিন্দার মানবিক দায়িত্ব না নিয়ে শুধু কৌশলগত নিরাপদ অঞ্চল তৈরি এবং গাজাকে ফিলিস্তিনি শূন্য করার দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে ইসরাইল।

হামলা আর উচ্ছেদের পাশাপাশি গাজাবাসীকে ধীরগতির মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে ত্রাণের গাড়ি আটকে রাখাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন যেখানে কয়েকশ ট্রাক ত্রাণ ঢোকার কথা, সেখানে যাচ্ছে তার অর্ধেকেরও কম। তাই বেশিরভাগ মানুষ এখন ক্ষুধার্ত, ধ্বংসস্তূপের নিচে পচে যাওয়া লাশ আর ভেঙে পড়া পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বেশিরভাগ আশ্রয়শিবিরে ইঁদুর ও চর্মরোগের মহামারি দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে একের পর এক ফিলিস্তিনি গ্রামে ঢুকে নতুন করে তাণ্ডব ও উগ্র হামলা শুরু করেছে ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। রামাল্লার উত্তর-পশ্চিমে দেইর আবু মিশাল গ্রামে লাঠি, ছুরি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। এতে বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *