মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ইরান সংক্রান্ত বিল পাস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এককভাবে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিল দেশটির আইনসভা। ইরানে নতুন করে যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। খবর বিবিসির।

স্থানীয় সময় বুধবার (৩ জুন) অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ২১৫টি ও বিপক্ষে ২০৮টি ভোট পড়ে। ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির চারজন কংগ্রেসম্যান (সংসদ সদস্য) সমর্থন দেওয়ায় এটি অনায়াসে পাস হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে যা একটি বড় ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক অনাস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতার লাগাম টানার এটি চতুর্থ প্রচেষ্টা। সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ- কংগ্রেসের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে পাস হলেও এই প্রস্তাবটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। এটিকে এখন রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষ সিনেটের অনুমোদন পেতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সিনেটে পাস হলেও এই প্রস্তাবটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকে পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। এর আগে গত মে মাসেও সিনেটে এই ধরনের একটি প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল।

বুধবারের এই ভোট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আবারও প্রকাশ্যে এনেছে। এর মাত্র কয়েকদিন আগেই রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের বরাদ্দ করা ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে বাতিল করতে হয়েছিল।

এবারের ভোটাভুটিতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়া চার রিপাবলিকান হলেন- থমাস ম্যাসি, ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, টম ব্যারেট ও ওয়ারেন ডেভিডসন।

মিশিগানের রিপাবলিকান সদস্য টম ব্যারেট বলেন, যুদ্ধ ঘোষণার একক অধিকার কেবল কংগ্রেসের, এটি আমাদের রক্ষা করতে হবে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয় পাচ্ছেন কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমার বিবেকের ডাকে ভোট দিয়েছি, এর ফলাফল যা-ই হোক আমি মেনে নিতে প্রস্তুত।

হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস এই ভোটকে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবৈধ ও ব্যয়বহুল ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় চড়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

এই প্রস্তাবের সহ-স্পন্সর মিকস বলেন, ট্রাম্প যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি যোগ করেন, আজকের এই ভোট একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এখন অনেক রিপাবলিকানই বুঝতে পারছেন যে, তাদের সাধারণ ভোটাররা মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো অন্তহীন যুদ্ধ চান না।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা আঘাত হানে। একইসঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে ইরানের উপকূলে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে মার্কিন প্রশাসন।

গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছালেও মাঠপর্যায়ে সংঘাত থামেনি। অতি সম্প্রতিও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে তেহরান।

অবশ্য এই ভোটাভুটির ঠিক আগেই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনা ‘খুব ভালো’ চলছে। চলতি সপ্তাহান্তেই হয়তো একটি চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আগের রাতে এবং গত রাতেও ওদের ওপর খুব শক্ত আঘাত করেছি। তবে তারা (ইরান) পাল্টা জবাব দিচ্ছে কারণ আমরা অন্য একটি কারণে তাদের কিছুটা উসকে দিয়েছিলাম।

প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন, তার প্রশাসনের অধিকাংশ সদস্যই ‘সবাইকে মেরে না ফেলে’ খুব দ্রুত একটি চুক্তির মাধ্যমে এই সংকটের অবসান চান। ট্রাম্পের ভাষায়, তাত্ত্বিকভাবে তারা চুক্তি সই করার খুব কাছাকাছি রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা বেশ ভালোই চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *