মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সুমেরু মহাসাগর আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সি রুট’ (এনএসআর) বা উত্তর সামুদ্রিক পথ ব্যবহার করে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু করেছে চীন। চীনা জাহাজ কোম্পানি ‘সি লেজেন্ড’ সম্প্রতি এই রুটে নিয়মিত কনটেইনার সার্ভিস চালু করেছে। তবে সময় ও পথ অর্ধেকে নেমে আসলেও আর্কটিকের পরিবেশগত এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করা ৫,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটটি রাশিয়ার উত্তর উপকূল দিয়ে গেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গ্রীষ্মকালে বরফ গলে যাওয়ার সময়সীমা বাড়ায় চীনের নিংবো-ঝুশান থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে এখন সময় লাগছে মাত্র ১৮ দিন, যেখানে সুয়েজ খাল হয়ে সময় লাগত ৪০ দিনেরও বেশি। চীনের জন্য ইলেকট্রিক বাহন, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সোলার পণ্যের মতো সংবেদনশীল রফতানি সামগ্রী ইউরোপে পাঠানোর ক্ষেত্রে এই রুটটিকে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মনে করা হচ্ছে।
২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যৌথভাবে এই ‘পোলার সিল্ক রোড’ বা মেরু রেশম পথ গড়ার কথা বলেছিলেন। শুরুতে রাশিয়া চীনের উপস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকলেও ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় মস্কো এখন চীনের ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার পারমাণবিক বরফভাঙা জাহাজ এবং রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানেই চলাচল করছে চীনা জাহাজগুলো।
তবে এই নতুন বাণিজ্যিক পথ নিয়ে শঙ্কিত পরিবেশবিদরা। আন্তর্জাতিক সংস্থা বেলোনা এনভায়রনমেন্টাল ফাউন্ডেশন এবং অ্যালিয়াঞ্জের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারী জ্বালানি তেল ব্যবহারের ফলে দুর্ঘটনাবশত তেল ছড়িয়ে পড়লে বা ‘ব্ল্যাক কার্বন’ নিঃসরিত হলে আর্কটিক অঞ্চলের সুসংবেদনশীল পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় বরফে আটকে পড়া তেল অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব এবং সুদূর এই দুর্গম অঞ্চলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।
পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়ার তেল বহনে একটি শ্যাডো ফ্লিট বা ছায়া নৌবহর এই রুটটি ব্যবহার করায় নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বেড়েছে। সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, নিরাপত্তার অভাব, উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও সীমিত মৌসুমের কারণে নর্দার্ন সি রুট এখনই সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির বিকল্প হতে পারবে না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএস/পিডিকে