স্বামী জুলাই বিপ্লবে শহীদ, স্ত্রী সাক্ষ্য দিতে এলে মেয়েকে ধর্ষণ, অপমানে আত্মহত্যা

ট্রাইব্যুনালে শহীদ জসিমের স্ত্রীর জবানবন্দি

জুলাই বিপ্লবে ছাত্রজনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন জসিম উদ্দিন। স্বামীর বিচারে ট্রাইব্যুনালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে আসেন স্ত্রী। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়েকে ধর্ষণ করে স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। ঘটনা জানাজানি হলে অপমানে ও মানসিক ট্রমায় আত্মহত্যা করে মেয়ে। আওয়ামী বর্বরতার শিকার হয়ে এভাবেই একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। স্বামী-সন্তান হারিয়ে একবুক হাহাকার নিয়ে বিচারের অপেক্ষায় দিন পার করছেন স্ত্রী।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্বামী ও সন্তানহারা রুমা বেগমের জবানবন্দিতে ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে আসে। জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, আমি শহীদ জসিম উদ্দিনের স্ত্রী। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৪১ বছর। আমার স্বামী মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ‘পদক্ষেপ’ এনজিওতে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করতেন। তিনি ১৮ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে ধাওয়া খেয়ে ফিরে আসেন। ওই দিন তিনি ধানমন্ডির কোনো এক জায়গায় গাড়ি রেখে এসেছিলেন। পরদিন সকালে আমি তাকে বাসা থেকে বের হতে দিচ্ছিলাম না, কারণ তিনি আন্দোলনে গিয়ে আঘাত পান। পরে জুমার নামাজের কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানায় আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফ্লোরে পড়ে আছে।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, একথা শোনার পর আমি পাগলের মতো ছোটাছুটি করি। পাশের বাসার ভাড়াটিয়ার থেকে আরো ১০ হাজার টাকা নেই। এরপর আমার চাচা শ্বশুর সালাম গাজীকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশ্যে হেঁটে রওনা হই। পথে পুলিশ আমাদেরকে বাধা প্রদান করে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পৌঁছে অপারেশন থিয়েটারের সামনে আমার স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি ট্রলিতে পড়ে থাকতে দেখি । (এসময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন)। তখন আমার স্বামীর জ্ঞান ছিল। সে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। সে বলেছিল, গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে গেছে এবং বুকে একটি গুলি লেগেছে। আমি দেখতে পাই, গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। আমার স্বামীর বুকের ক্ষতস্থানে এবং পিঠে গুলি বের হওয়ার স্থানে গজ ভরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে; তা সত্ত্বেও রক্ত বের হচ্ছিল। আমার স্বামী আরও জানায়, জুম্মার নামাজ পড়ে তিনি আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে যান। সেখানে আমার স্বামী পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন।

জবানবন্দিতে শহীদ জসিমের স্ত্রী বলেন, ডাক্তার জানায় অপারেশন করতে রক্ত লাগবে। ওইদিন হাসপাতালে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীরা আসায় চিকিৎসা দিতে ডাক্তার ও নার্সরা হিমশিম খেয়ে যায়। আমার স্বামীর জ্ঞান ছিল, তাই তার অপারেশন হয় সবার শেষে। আনুমানিক রাত আড়াইটার সময় অপারেশন শেষে তাকে অবজারভেশন রুমে রাখে। কিন্তু তার শরীর থেকে অনবরত রক্ত বের হচ্ছিল। ব্যান্ডেজ খুলে দেখি তার দুটি আঙুল নেই এবং সেখানে পচন ধরে গেছে। বিষয়টি ডাক্তারদের জানালে তারা আঙুল কেটে ফেলে। পরে তার বুকে আরেকটি অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর আমার স্বামীর আর জ্ঞান ফেরেনি। এরপর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ২৯ জুলাই সকাল ৯টার দিকে তিনি মারা যান। (এসময় সাক্ষী পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়েন)।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া আমার স্বামীর লাশ দিতে না চাইলে আমরা বনানী থানায় যাই। বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি মহাখালী এলাকায় অবস্থিত। বনানী থানা ক্লিয়ারেন্স না দিয়ে আমাদেরকে মোহাম্মদপুর থানায় যেতে বলেন। মোহাম্মদপুর থানায় এলে তারা জানায় আমাদের এখানে কোনো গুলি হয়নি, আপনারা বনানী থানায় যান। এভাবে আমরা ওইদিন সারারাত এবং পরদিন দুপুর পর্যন্ত ২-৩ বার বনানী এবং মোহাম্মদপুর থানায় যাওয়া-আসা করি। এরপর দুপুর ৩টার দিকে আমি হাসপাতালের সামনে তিনটি ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকি এবং আমার স্বামীর লাশ দিতে অনুরোধ করি। তখন কোলে সাত মাসের একটি বাচ্চা ছিল। এরপর আবার বনানী থানায় গেলে ওসি বলে তার কিছু করার নেই, উপর মহলের হুকুমে ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছে না। পরবর্তীতে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করি। কারণ শর্ত ছিল, মামলা দায়ের না করলে লাশ দিবে না। পরে ৩১ জুলাই লাশ পাই। এরপর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে লাশ দাফন করি।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম আরও বলেন, আমার মেয়ে লামিয়ার ফোনে দেখতে পাই খুনি হাসিনা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে। এর কিছুদিন পর আমি ঢাকায় আসি। তখন ফেসবুক, ইউটিউব, পত্র-পত্রিকা, ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং স্থানীয় লোকমুখে জানতে পারি, শেখ হাসিনা, মেয়র তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকদের নির্দেশে পুলিশ কমিশনার হাবিব, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার, রওশানুল হক সৈকতদের সহায়তায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এম এ সাত্তার, তোফায়েল সিদ্দিকি তুহিন, ইসমাইল হোসেনসহ আরও অনেকে আমার আমার স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িত। আমি ১৫ বছর ধরে মোহাম্মদপুর শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকি। আমি এদেরকে আগে থেকেই চিনি।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আমি তাকে জবানবন্দি দিতে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ঢাকায় আসি। আমার বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল। তাই তাকে বাড়িতে রেখে আসি। ১৮ মার্চ মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত করে আসার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। আমি এই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিতে আসার কারণে তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে। এ খবর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পর মেয়ে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করে। (সাক্ষী এসময় পুনরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন)। আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *