গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে এক স্কুলছাত্রী ও এক যুবককে জনসম্মুখে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর খবর পাওয়া গেছে। নির্যাতনের সেই দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর অপমান ও লোকলজ্জায় বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে ভুক্তভোগী ওই স্কুলছাত্রী।
গত সোমবার (২৮ জুলাই) দুপুরে উপজেলার হাতিয়াড়া ইউনিয়নের রাহুথড় উদয়ন বিদ্যাপীঠ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঘটে।
গতকাল শুক্রবার (৩১ জুলাই) নির্যাতনের সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় ওঠে। সচেতন মহল এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী রাহুথড় উদয়ন বিদ্যাপীঠের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে পার্শ্ববর্তী মুকসুদপুর উপজেলার ধর্মরায়ের বাড়ি গ্রামে নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। অপর ভুক্তভোগী যুবক কাশিয়ানীর রাহুথড় গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ জুলাই স্কুল চলাকালে ওই ছাত্রীকে রাহুথড় বড় ব্রিজ এলাকা থেকে ধরে এবং যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে এনে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি দেবদারু গাছের সঙ্গে গামছা দিয়ে দুজনকে বেঁধে ফেলা হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে তাদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হয় এবং উপস্থিত অনেকে তা ভিডিও করেন।
ভুক্তভোগী ছাত্রী জানান, স্কুল প্রাঙ্গণে আমাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করার সময় অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি বা প্রতিবাদ করেনি।
এ ঘটনায় হাতিয়াড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নয়ন গোলদার, স্থানীয় যুবক জয় শিকদার ও মিশন রায়সহ আরও কয়েকজন জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নয়ন গোলদার দাবি করেন, এলাকার যুবকেরা তাদের আমার বাড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাদের স্কুলে নিয়ে অভিভাবকদের হাতে তুলে দিই, কিন্তু গাছে বাঁধার বিষয়ে কিছু জানি না।
ভিডিও ভাইরালের পর লোকলজ্জায় বিষপান করা ওই ছাত্রীকে প্রথমে রাহুথড় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে এবং পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর থেকে ভীতি ও আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার দুটি প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন ঘটনা ঘটলেও তিন দিনেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিৎ সরকার জানান, ঘটনার দিন তিনি স্কুলে ছিলেন না এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহিন মিয়া বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে বিষয়টি জানায়নি, ভিডিও দেখে জেনেছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আজ শনিবার জানান, তিনি ভিডিওটি দেখেছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।