আশ্রয়কেন্দ্র ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’–এর প্রতিষ্ঠাতা ও আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও মারধরের অভিযোগে ভুক্তভোগী যুবক নাহিদ হাসান বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
আজ শনিবার (২৯ আগস্ট) মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম। মামলার বাদী নাহিদ হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজ ‘উজান টিভি’র কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
এর আগে, ভুয়া মৃত্যু সনদ তৈরি, আশ্রয়কেন্দ্রে অসহায় ব্যক্তিদের নির্যাতন, মানবপাচারসহ নানা অভিযোগে ২০২৪ সালের ১ মে মিল্টন সমাদ্দারকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় তিনটি মামলা করা হয়।
এরপর মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে দুস্থ, অসহায় ব্যক্তিদের আশ্রয় ও সাহায্যের মতো মানবিক কাজের আড়ালে ডেথ সার্টিফিকেট জালিয়াতি, মানবপাচার, আশ্রয় দেওয়া অসহায়, দুস্থ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের কিডনি বিক্রি, জমি দখলসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠে আসে।
মামলার এজাহারে বাদী নাহিদ হাসান বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ছাড়াও তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার বকুলতলা এলাকার দশকুড়াসংলগ্ন সড়কে গত ২৩ আগস্ট দুপুরে পরিচয়বিহীন ও অসুস্থ এক বৃদ্ধাকে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। এরপর মিল্টন সমাদ্দারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ওই বৃদ্ধাকে তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় ও সেবা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন নাহিদ হাসান।
তবে মিল্টন সমাদ্দার ওই বৃদ্ধাকে তার প্রতিষ্ঠানে সেবা ও আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে মাসিক ১৮ হাজার টাকা দাবি করেন। বিষয়টি নাহিদ হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন এবং মিল্টন সমাদ্দারের মানবসেবা সংক্রান্ত কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই ভিডিও প্রকাশের পর মিল্টন সমাদ্দারের কার্যক্রম নিয়ে ফের বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে মিল্টন সমাদ্দার ওই বৃদ্ধকে তার আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে বলেন।
মিল্টন সমাদ্দারের কথামতো গত ২৫ আগস্ট শরণখোলা উপজেলা থেকে রওনা হয়ে ওই বৃদ্ধাকে নিয়ে রাত আড়াইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সাভারের চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ারে পৌঁছেন নাহিদ হাসান। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিল্টন সমাদ্দারের সমালোচনা করার জেরে মিল্টন সমাদ্দার ও তার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার দেবাশীষ এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাচ-সাতজন অতর্কিতভাবে নাহিদ হাসানের ওপর হামলা চালান।
নাহিদ হাসানের অভিযোগ, একপর্যায়ে মিল্টন সমাদ্দার তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। একপর্যায়ে মিল্টন সমাদ্দার ভয়ভীতি দেখিয়ে নাহিদের কাছ থেকে জোরপূর্বক তার দায়মুক্তি ও পক্ষপাতমূলক বক্তব্য-সংবলিত একটি ভিডিও ধারণ করে রাখেন। আগের পোস্টটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় নিজের অপরাধ ও দায় এড়ানোর উদ্দেশ্যে মিল্টন সমাদ্দার ওই বৃদ্ধাকে তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে রেখে দেন এবং নাহিদ ও তার সঙ্গে থাকা মো. ইলিয়াস হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেন।
নাহিদ হাসান আরও অভিযোগ করে বলেন, মিল্টন সমাদ্দার বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ করে তাকে বেধড়ক মারধর করেন। একই সঙ্গে অজ্ঞাত পরিচয়ের বৃদ্ধাকে আশ্রয় দেওয়ার বিনিময় তার কাছ থেকে টাকা চাওয়া হয়নি—এমন স্বীকৃতিমূলক ভিডিও বক্তব্যও জোর করে নেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিল্টন সমাদ্দারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। হোয়াটস অ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফেসবুকে মিল্টন সমাদ্দারের এক কোটি ৬০ লাখ ফলোয়ার রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ‘বাবা-মা’ সম্বোধন করেন এবং তাদের জন্য রান্নার ভিডিও ফেসবুক পেজে তুলে ধরে ১০টির বেশি মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরের মাধ্যমে অনুদান সংগ্রহ করেন তিনি। তবে দুস্থ, অসহায় ব্যক্তিদের আশ্রয় ও সাহায্যের মতো মানবিক কাজের আড়ালে মৃত্যু সনদ জালিয়াতি, মানবপাচার, আশ্রয় দেওয়া অসহায়, দুস্থ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের কিডনি বিক্রি, জমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার অনুদান সংগ্রহে ভাটা পড়ে।