বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে এক ধরনের বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—একদিকে সরকারি খাতে প্রায় পাঁচ লাখ পদ শূন্য, অপরদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে। এই পরিস্থিতি এখন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু চাকরির সংকট নয়, প্রশাসনিক কাঠামো ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে মোট ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী সংসদ সদস্য সারওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি এই তথ্য জানান। পরিসংখ্যানটি ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে।
গ্রেডভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, গ্রেড ১–৯ পর্যায়ে শূন্য রয়েছে ৬৮ হাজার ৮৮৪টি পদ, গ্রেড ১০–১২ পর্যায়ে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি, গ্রেড ১৩–১৬ পর্যায়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি এবং গ্রেড ১৭–২০ পর্যায়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ। এছাড়া অন্যান্য শ্রেণিতে আরও ৮ হাজার ১৩৬টি পদ খালি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে গ্রেড ১৩–২০ পর্যায়ে, যা মাঠপর্যায়ের সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেবায় চাপ বাড়ছে এবং সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নিয়োগ পরিকল্পনা ও বাস্তবতা
সরকার শূন্য পদ পূরণে ধাপে ধাপে নিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২ হাজার ৮৭৯টি পদ ছয় মাসে, ৪ হাজার ৪৫৯টি পদ এক বছরে এবং ৩ হাজার ১১০টি পদ পাঁচ বছরে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয়কে শূন্য পদের তথ্য ও নিয়োগ পরিকল্পনা নিয়মিত জমা দিতে বলা হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ জমে থাকার পেছনে নতুন পদ সৃষ্টি ও অবসরজনিত শূন্যতা পূরণের ভারসাম্যহীনতাকে দায়ী করছেন কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়োগ প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়ে বলে জানান তারা।
বাড়ছে শূন্য পদ, বাড়ছে বেকারত্ব
সরকারি তথ্য বলছে, গত এক দশকে অনুমোদিত ও শূন্য পদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১০ সালে অনুমোদিত পদ ছিল ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৮২, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫১৮-এ। একই সময়ে শূন্য পদও ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৭ থেকে বেড়ে কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০-এ দাঁড়ায়।
এদিকে বেকারত্বও বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং মোট বেকার সংখ্যা ২৭ দশমিক ৩ লাখ। এক বছরে এটি ৩ দশমিক ৩ লাখ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবে বেকারত্বের হার আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেকেই আংশিক কর্মসংস্থানে থাকলেও স্থায়ী চাকরি পান না।
বিশেষজ্ঞদের মত
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের ভাষ্য, শূন্য পদ পূরণের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবায়নের গতি ধীর। তার মতে, দ্রুত নিয়োগ দেওয়া গেলে লাখো পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোবাশ্বের মোনেম জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে যেখানে সাড়ে তিন বছর লাগত, এখন তা এক বছরে নামানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ১০ মাসে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাদের মতে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময়ই নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত।
সংস্কার উদ্যোগ
সরকার জানিয়েছে, নিয়োগ ব্যবস্থায় মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে পূরণ করা হয়। বাকি পদগুলো সংরক্ষিত কোটার আওতায় থাকে।
এছাড়া মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস সংস্কার এবং মৌখিক পরীক্ষায় বিশ্লেষণী ও আচরণগত দক্ষতা মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক চিত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন শূন্য পদ থাকার কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষা সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে সরকারি চাকরির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও বেসরকারি খাতের সীমিত সম্প্রসারণ শ্রমবাজারে চাপ বাড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশে প্রায় পাঁচ লাখ শূন্য পদের বিপরীতে প্রায় ২৭ লাখ বেকার মানুষের উপস্থিতি কর্মসংস্থান ব্যবস্থার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর সমাধানের জন্য দ্রুত নিয়োগ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কার জরুরি।
এসএন/পিডিকে