রেকর্ড, রান আর দায়িত্ববোধ-৩৯ বছরে আইসিসির সেরা মুশফিক

বাংলাদেশ ক্রিকেটে নির্ভরতার আরেক নাম মুশফিকুর রহিম! সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, জাতীয় দলে এসেছে নতুন নতুন মুখ। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে ব্যাট হাতে দলের ভরসা হয়ে দাঁড়ানোর চিত্রটি খুব একটা বদলায়নি। পাকিস্তানের বিপক্ষে দেশের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের পথে সেই চেনা মুশফিককেই দেখা গেছে আবারও। আর সেই পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে মে মাসের আইসিসি ‘প্লেয়ার অব দ্য মান্থ’ নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।

গত সোমবার রাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) মে মাসের সেরা ক্রিকেটারদের নাম ঘোষণা করে। পুরুষদের বিভাগে মুশফিকুর রহিম সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান। এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত অন্য দুই ক্রিকেটার ছিলেন বাংলাদেশের স্পিনার তাইজুল ইসলাম এবং নেপালের অলরাউন্ডার দিপেন্দ্র সিং আইরি। শেষ পর্যন্ত ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা, ম্যাচের প্রেক্ষাপট এবং দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার কারণে সবার ওপরে জায়গা করে নেন মুশফিক।

বাংলাদেশের জন্য মে মাসটি ছিল বিশেষ এক অর্জনের মাস। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। সেই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন মুশফিক। দুই টেস্টে একটি সেঞ্চুরি ও একটি ফিফটির সাহায্যে ২৫৩ রান করেন তিনি। গড় ছিল ৬৩.২৫। শুধু রান করাই নয়, তিনি রান করেছেন দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়ে, চাপের মুহূর্তে এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতিতে।

মিরপুরে সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ যখন চাপে, তখন ৭১ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে দলের ভিত গড়ে দেন মুশফিক। তবে সিরিজের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে সিলেটে দ্বিতীয় টেস্টে। সেখানে তিনি খেলেন ১৩৭ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনের মিশেলে সাজানো সেই সেঞ্চুরি শুধু বাংলাদেশের জয়ের পথই প্রশস্ত করেনি, ব্যক্তিগতভাবেও তাকে নিয়ে গেছে নতুন এক উচ্চতায়। ওই ইনিংসের মাধ্যমে মমিনুল হককে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক সেঞ্চুরির রেকর্ড নিজের করে নেন তিনি।

সিরিজজুড়ে তার অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজসেরার পুরস্কারও জেতেন মুশফিক। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস খেললেও এই অর্জনটি তাঁর সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছে।

আইসিসির মাসসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটিও মুশফিকের জন্য নতুন নয়। এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে প্রথমবার এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। পাঁচ বছর পর আবারও মে মাসেই একই সম্মান অর্জন করলেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। এর মাধ্যমে তিনি সাকিব আল হাসানের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে একাধিকবার আইসিসির মাসসেরা হওয়ার কীর্তি গড়লেন।

পুরস্কার জয়ের পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় মুশফিক ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলীয় সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, টেস্ট ক্রিকেটে পারফরম্যান্সের জন্য এই স্বীকৃতি পাওয়া আনন্দের এবং গর্বের। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ে সতীর্থ তাইজুল ইসলামের অবদানের কথাও স্মরণ করেছেন তিনি। দুই টেস্টে ১৩ উইকেট শিকার করে তাইজুলও ছিলেন বাংলাদেশের সাফল্যের অন্যতম স্থপতি এবং মাসসেরা পুরস্কারের দৌড়েও ছিলেন।

মুশফিক আরও উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় শুধু একটি সিরিজ জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় বাংলাদেশকে এগিয়ে দিয়েছে এবং দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সতীর্থ, কোচিং স্টাফ এবং সাপোর্ট স্টাফদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি ভবিষ্যতেও দেশের সাফল্যে আরও বেশি অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক রেকর্ডের মালিক মুশফিকুর রহিম। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত অন্য জায়গায়। তিনি এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। ৩৯ বছর বয়সেও ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং পারফরম্যান্সের ক্ষুধায় তরুণদের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি। তাতেই ধরা দিচ্ছে সাফল্য!

এসএন/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *