মার্কিন সামরিক সহায়তার চুক্তির চেয়েও কয়েক বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র কিনেছে ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সামরিক সহায়তা চুক্তির আওতায় পাওয়া অর্থের চেয়েও কয়েক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার আদেশ দিয়েছে ইসরায়েল। এসব অস্ত্রের মূল্য পরিশোধ করতে ২০২৮ সালের পর অতিরিক্ত প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের পাঠানো একটি নথির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের আগে থেকেই দেওয়া অস্ত্রের ক্রয়াদেশগুলোর বিপরীতে এই অর্থ প্রয়োজন হবে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ এপ্রিল পর্যন্ত ইসরায়েলের যেসব অস্ত্রের ক্রয়াদেশ বকেয়া ছিল, সেগুলোর হিসাবের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক সহায়তা চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার পরও এই অর্থের প্রয়োজন হবে। তবে এপ্রিলের পর থেকে বকেয়া অর্থের পরিমাণে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

মঙ্গলবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। তার এই ঘোষণায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের কর্মকর্তাসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সময়, স্বাক্ষরিত, ১০ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে ইসরায়েল প্রতিবছর ৩৩০ কোটি ডলার বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন পেয়ে থাকে। পাশাপাশি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য পায় আরও ৫০ কোটি ডলার। ২০২৮ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, চুক্তির বাকি দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সামরিক অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ইসরায়েলের বকেয়া সব অস্ত্রের ক্রয়াদেশের মূল্য পরিশোধের জন্য এই অর্থ যথেষ্ট নয়।

বকেয়া অস্ত্রের মূল্য কে পরিশোধ করবে?

অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের একটি চিঠির মাধ্যমে। টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রোর কার্যালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে ইসরায়েলের সামরিক অর্থায়নসংক্রান্ত দায়দেনার তথ্য তুলে ধরা হয়। ইসরায়েলের সামরিক ক্রয়াদেশের বিপরীতে অর্থের দায় কতটা রয়েছে, তা জানতে চেয়েছিলেন কাস্ত্রো।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বকেয়া অর্থের দায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা, ইসরায়েলের নিজস্ব সরকারি তহবিল অথবা উভয় উৎসের সমন্বয়ে মেটানো যেতে পারে।

কাস্ত্রো বলেন, ‘২০২৮ সাল পর্যন্ত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ পূর্ণ হলেও এর বাইরেও আরও ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। আর সেই অর্থ কে পরিশোধ করবে, সেটিই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’

ইসরায়েলের সামরিক সরঞ্জাম কেনার ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়ার কথা এমন অর্থের বিপরীতেও আগাম ক্রয়াদেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে অর্থ হাতে পাওয়ার আগেই দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র কেনার চুক্তি করতে পারে দেশটি।

এ কারণে প্রতিবছরের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিলেই আগে থেকে করা অস্ত্র কেনার চুক্তি বা সেগুলোর বিপরীতে সৃষ্ট আর্থিক দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে না।

বকেয়া ক্রয়াদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো আরও ২৫টি ‘এফ-৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা। ২০২৪ সালের জুনে, এসব যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২৮ সাল থেকে বিমানগুলোর সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা।

এদিকে, আগামী এক দশকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। 

তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মার্কিন সহায়তা দ্রুত বন্ধ করা হলে দেশটির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সামরিক সহায়তার বদলে যৌথ অস্ত্র উৎপাদনের পথে ওয়াশিংটন?

বিদ্যমান সামরিক অর্থায়ন কাঠামোর কিছু অংশের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদন সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আইন প্রণয়নের কথা ভাবছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতিসংক্রান্ত আইন ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আইনটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

প্রস্তাবটির সমর্থকদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা দুই দেশের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও গভীর করতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের সুযোগ বাড়বে।

এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সহযোগিতায় তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’-কে সম্ভাব্য সুফলের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন তাঁরা।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে পেন্টাগনের ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন বা আইনপ্রণেতার পক্ষে সামরিক সহযোগিতা কমানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

পরিস্থিতি অনুযায়ী, পরিবর্তন হলেও, মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের ওপর ইসরায়েলের তাৎক্ষণিক নির্ভরশীলতার বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যাবে। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে বিপুল পরিমাণ বোমা ও অন্যান্য গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব অস্ত্রের প্রয়োজনও এখনো রয়েছে ইসরায়েলের।

স্বাধীনভাবে মার্কিন অস্ত্র কেনার অর্থ জোগাড় করতে হলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭ শতাংশ ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হয়।

এছাড়া ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা কমানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ওই আইন অনুযায়ী, আঞ্চলিক সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার গুণগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হবে ওয়াশিংটনকে।

গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর দেশটিকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলেই সমালোচনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের সাফল্যের পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল এল-সাঈদ। ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে প্রচার চালানোর পর মিশিগান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

আব্দুল এল-সাঈদ ইসরায়েলের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ট্রাম্পের ঘোষণার চেয়েও কঠোর। কারণ, ট্রাম্প সরাসরি আর্থিক সহায়তা বন্ধের কথা বললেও অস্ত্র বিক্রি চালু রাখার বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করেননি।

এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

তবে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত সময়সীমার মধ্যে সামরিক সহায়তা বন্ধ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কংগ্রেসের আগে থেকে অনুমোদিত বরাদ্দ এবং অস্ত্র কেনার বিদ্যমান চুক্তির কারণে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন জটিল হতে পারে।

গাজা যুদ্ধের সময় বাইডেন প্রশাসনের ইসরায়েলনীতি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা জশ পল বলেন, দ্রুত সহায়তা বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের শেষ নাগাদ সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কংগ্রেস ইতোমধ্যে যে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে, তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।’

জশ পল আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থনযোগ্য কোনো প্রমাণ আমরা দেখিনি।’

অস্ত্র কেনার ক্রয়াদেশের বিপরীতে বকেয়া ১০ বিলিয়ন ডলারের বিষয়টি সামনে আসায় কয়েক দশকের সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তার পরিবর্তে নতুন কোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুই দেশের সামনে থাকা আর্থিক জটিলতা স্পষ্ট হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *