বিশ্ব বাঘ দিবস আজ : সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা

দেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবন। তবে নিজের এই প্রাকৃতিক আবাসস্থলেই নানা হুমকির মুখে রয়েছে বাঘ। চোরাশিকারী চক্র, জলবায়ু পরিবর্তন, বনদস্যুদের তৎপরতা এবং সুন্দরবনের ওপর ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চাপ বাঘের অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে সুন্দরবনে ৬১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

তবে আশার খবর হলো, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত কয়েক দফার ক্যামেরা ট্র্যাপিংভিত্তিক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি জরিপে গড়ে প্রায় ১০টি করে বাঘ বেড়েছে। বনজীবী, বনকর্মী ও পর্যটকদের ভাষ্যেও আগের তুলনায় সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতি এখন বেশি চোখে পড়ছে। সম্প্রতি বন বিভাগের ক্যামেরায়ও একাধিক বাঘ ধরা পড়েছে।

আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস। সুন্দরবনসংলগ্ন জেলার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার বাইরে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সুন্দরবনে চোরাশিকারীদের পেতে রাখা ফাঁদ থেকে একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। কয়েকদিন ধরে ফাঁদে আটকে থাকায় প্রায় ১০ বছর বয়সী বাঘিনীটির অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তোলার পর বন থেকে উদ্ধারের ছয় মাস পর গত ১২ জুলাই সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।

ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ গণনা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে প্রথম ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে গণনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে একই পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৪টি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের জরিপে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায় ১২৫টি।

সাম্প্রতিক সময়েও সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতির একাধিক প্রমাণ মিলেছে। গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এলাকায় একটি বাঘকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এছাড়া ওই এলাকায় সম্প্রতি স্থাপন করা ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরায় এক সপ্তাহে ধারণ করা ছবি বিশ্লেষণ করে পৃথক তিনটি বাঘ শনাক্ত করেছে বন বিভাগ।

বন বিভাগ বলছে, আগের তুলনায় বাঘের লোকালয়ে চলে আসার প্রবণতা কমেছে। একই সঙ্গে মানুষ ও বাঘের সংঘাতও কমেছে। বনকর্মী ও পর্যটকদের অনেকেই এখন জোড়া জোড়া বাঘ দেখতে পাচ্ছেন।

২৫ বছরে ৬১ বাঘের প্রাণহানি

সুন্দরবন বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে সুন্দরবনে ৬১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুর্বৃত্তদের হাতে ২৬টি, লোকালয়ে জনতার হাতে ১৪টি, স্বাভাবিকভাবে ১৯টি এবং ঘূর্ণিঝড় সিডর ও অন্যান্য কারণে দুটি বাঘ মারা গেছে। একই সময়ে বাঘের চামড়া ও হাড়গোড়ও উদ্ধার করা হয়েছে।

এ সময়ে বাঘের আক্রমণে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ এলাকায় ১৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ৬১টি বাঘের মধ্যে পূর্ব বিভাগে ৩০টি এবং পশ্চিম বিভাগে ৩১টির মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বে বাঘের সংখ্যা কমলেও আশার খবর সুন্দরবনে

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক শতকে বিশ্বের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বাঘের সংখ্যা প্রায় এক লাখ থেকে কমে সাড়ে পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে। বাঘের নয়টি উপ-প্রজাতির মধ্যে বালিনিজ টাইগার, জাভানিজ টাইগার ও কাস্পিয়ান টাইগার ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভুটান, নেপাল ও রাশিয়াসহ মাত্র ১০টি দেশে বাঘ টিকে আছে।

বিশ্বজুড়ে বন উজাড়, চোরাশিকার ও বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে বাঘ এখন মহাবিপন্ন প্রজাতি। এমন বাস্তবতায় সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাঘের জন্য আরও নিরাপদ হয়েছে সুন্দরবন, বলছে বন বিভাগ

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বাঘ ও হরিণসহ বনজসম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ নিয়মিত নানা অভিযান পরিচালনা করছে। পায়ে হেঁটে বন তল্লাশি করা হচ্ছে, অভিযানে ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে। গত এক বছরে সুন্দরবন থেকে বাঘ ও হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৭০ জন হরিণ শিকারীকে আটক করা হয়েছে এবং ১৫০ জন চোরাশিকারীর তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে।

তার ভাষায়, বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে চোরাশিকারীদের তৎপরতা আগের তুলনায় কমেছে। সে কারণে সুন্দরবনে বাঘের বিচরণও বেড়েছে।

ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী আরও জানান, গত কয়েক বছরে লোকালয়ে গিয়ে কোনো বাঘ মারা যায়নি। বাউন্ডারি ফেন্সিং থাকায় বাঘ সীমান্ত এলাকায় গিয়ে আবার বনে ফিরে আসছে। বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে। সমান্তরাল (প্যারালাল) পদ্ধতিতে তল্লাশি পরিচালনার ফলে বনে ফাঁদ পাতা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেজাউল করিম চৌধুরী আরও বলেন, বনের হাঁটার পথ, পুকুরপাড়, খালের ধারে এমনকি বন বিভাগের কার্যালয়ের আশপাশেও মাঝেমধ্যে বাঘ দেখা যাচ্ছে। পর্যটকরাও সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে বাঘ দেখতে পাচ্ছেন। একসঙ্গে তিনটি বাঘ ঘোরাফেরা করতেও দেখা গেছে। আগের চেয়ে সুন্দরবনে বাঘ অনেক বেশি নিরাপদ এবং আগামী গণনায় বাঘের সংখ্যা আরও বাড়বে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের বাঘসহ বনসম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ সব সময় সতর্ক রয়েছে। বাঘ সংরক্ষণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল আগামী বাঘ গণনায় প্রতিফলিত হবে।

বনজীবীদের অভিজ্ঞতায়ও বেড়েছে বাঘের উপস্থিতি

সুন্দরবনের দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে সুন্দরবনকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই সময়ে ৫০ বারেরও বেশি বাঘ দেখেছেন। কখনও খুব কাছ থেকে, আবার কখনও দূর থেকে বাঘ দেখেছেন। প্রতিটি বাঘের ডোরাকাটা দাগ ও রঙ আলাদা। তবে নিজের চোখে সুন্দরবনের বাঘ দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

কামাল উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, বাঘ সুন্দরবনে অবাধে বিচরণ করে। তবে তাদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে প্রজননে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাঘিনীর নিরাপদ প্রজননের জন্য বনের প্রজননস্থলগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। বর্তমানে আগের তুলনায় বাঘের বিচরণ অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে এবং সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে বলেই আমি মনে করি।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, চোরাশিকারী, মাছ ধরতে বিষ প্রয়োগ এবং বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে সুন্দরবনের বাঘ হুমকির মুখে রয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপও রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের পরও গত ১২ বছরে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমেনি; বরং কিছুটা বেড়েছে। এটিকে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঘ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিদ্যমান হুমকিগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বনের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমাতে হবে, বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং বাঘ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগেরও দাবি জানাচ্ছি।

ড. আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অনেক নদী ও খাল পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব নদী-খাল নিয়মিত খনন করতে হবে। কারণ নদী-খালে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে একসময় সুন্দরবনের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। আর সুন্দরবন না থাকলে দেশের একমাত্র আবাসস্থল হারিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও টিকে থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *