বিশ্বকাপে অনন্য মেসি, আরও একটি মহাকাব্য লেখার অপেক্ষায়

২০২২ সালে কাতারে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতে সোনালী ট্রফি ছুঁয়ে দেখছেন লিওনেল মেসি। ছবি : এএফপি

মারাকানার সেই বিকেল, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল। জার্মানির কাছে হেরে ট্রফিটার পাশ দিয়ে এক বিষণ্ণ রাজপুত্রের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য এখনো ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করে। অভিমানে, বেদনায় নীল হয়ে সেদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন লিওনেল মেসি।

অনেকেই ভেবেছিলেন, মহাকাব্যের শেষ পাতাটি বুঝি ট্র্যাজেডি দিয়েই লেখা হলো। কিন্তু ফুটবল বিধাতা যার পায়ে জাদুদণ্ড সঁপে দিয়েছেন, তাঁর গল্প কি এত সহজে শেষ হতে পারে? কোচের অনুরোধ আর কোটি ভক্তের প্রার্থনায় ফিরে এসেছিলেন তিনি। আর সেই প্রত্যাবর্তন কেবল রঙিনই নয়, হয়ে উঠেছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত উপাখ্যান।

প্রথধমবার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিতে চুমু এঁকে দিচ্ছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।

এক বর্ণিল ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য সব শিরোপাই ছোঁয়া হয়েছিল মেসির। অলিম্পিক সোনা থেকে শুরু করে কোপা আমেরিকা—সবই ছিল অর্জনের খাতায়। তবুও একটা জায়গায় ছিল শূন্যতা, একটা অপূর্ণতার হাহাকার। যে সোনালী ট্রফিটার জন্য এক প্রজন্ম ফুটবলকে ভালোবেসেছে, সেই বিশ্বকাপটাই যে অধরা ছিল।

অবশেষে ২০২২ সালের কাতারের মরুদ্যানে পূর্ণতা পায় সেই আরাধ্য স্বপ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন মেসি সেই সোনালী ট্রফিতে চুমু এঁকে উঁচিয়ে ধরলেন, ফুটবল যেন নিজেই ধন্য হলো তার হাতে ধরা দিয়ে।

৩৫ বছর বয়সে বিশ্বজয় করার পরও মাঠের সবুজ ঘাসে এখনো ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছেন এলএমটেন। তার এই অবিশ্বাস্য ফর্ম দেখে ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তিরাও আজ বিস্মিত হয়ে ভাবেন— মেসি আসলে আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, নাকি অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসা ফুটবল-ঈশ্বর!

বিশ্বকাপ জয়ের আগের বছর ২০২১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার ট্রফি উদযাপন করছেন মেসি।

তাঁকে নিয়ে প্রতিপক্ষ ও সতীর্থদের মুগ্ধতা রূপ নিয়েছে রূপকথায়। বুলগেরিয়ার কিংবদন্তি হ্রিস্তো স্তোইচকোভ মেসিকে নিয়ে বলেন, ‘একসময় বলা হতো, আমাকে থামানোর জন্য কেবল একটি পিস্তলের প্রয়োজন। আজ মেসিকে থামাতে আপনার একটি মেশিনগান লাগবে।’

গোলরক্ষকদের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ইতালির সাবেক গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফন। যিনি গোলবারের মুখে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই বুফন মেসিকে ছুঁয়ে দেখেছেন তিনি মানুষ নাকি এলিয়েন নিশ্চিত হতে। বুফন বলেছেন, ‘মেসির সাথে যখন আমার দেখা হয়েছিল, আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম। বাকি সবার মতো সেও একজন সাধারণ মানুষ কি না, তা আমার নিশ্চিত হওয়ার দরকার ছিল।’

মেসির এক সময়ের জাতীয় দলের সতীর্থ আনহেল ডি মারিয়া মনে করেন- মেসি মানুষ নয়, সে একজন এলিয়েন। ডি মারিয়া বলেছেন, ‘সে মানুষ নয়, মানুষ হতেই পারে না। সে একজন এলিয়েন।’

বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জিতেছেন মেসি।

আজকের এই মহাজাগতিক মেসির শুরুর গল্পটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। বিখ্যাত মার্কিন গায়ক লিওনেল রিচির গানের ভক্ত ছিলেন মেসির মা, তাই আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘লিওনেল’। 

শৈশবে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতিজনিত সমস্যায় ভোগা মেসি যখন ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় ট্রায়াল দিতে আসেন, তখন তার উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। শারীরিক গঠন আর চিকিৎসার বিপুল খরচের কথা ভেবে বার্সার নীতিনির্ধারকরা প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু জহুরি যেমন রত্ন চিনতে ভুল করেন না, তেমনি ক্লাবের তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর চার্লি রেক্সাচ মেসির প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন।

মেসিকে হারানোর ভয়ে কোনো অফিসিয়াল কাগজ না পেয়ে তড়িঘড়ি করে দুপুরের খাবারের টেবিলে একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপারেই স্বাক্ষর করিয়েছিলেন ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক চুক্তিটির!

লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার মানেই রেকর্ডের এক বিশাল মহাসমুদ্র। ক্লাব ও জাতীয় দল— সবখানেই তার রাজকীয় পদচারণা। বার্সেলোনার হয়ে ১৭টি গৌরবময় মৌসুমে তিনি জিতেছেন রেকর্ড ৩৪টি শিরোপা। এরপর পিএসজির হয়ে টানা দুটি লিগ ওয়ান ট্রফি এবং পরবর্তীতে ইন্টার মায়ামিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম এমএলএস কাপ জিতিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলে সব মিলিয়ে তার ৪০টি শিরোপা জয়ের রেকর্ডটি বিশ্ব ফুটবলে অনন্য।

২০১৯ সালে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ পুরষ্কার ব্যালন ডি’অরের সঙ্গে ফটোসেশনে মেসি।

আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতেও তার সাফল্যের ঝুলি পূর্ণ। অনুর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অলিম্পিক সোনা, ফিনালিসিমা এবং দুটি কোপা আমেরিকা জয়ের পর ২০২২ সালে এসেছে তার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ মুকুট— ফিফা বিশ্বকাপ। ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন রেকর্ড ৮ বার। মাঠের অনন্য ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং আর দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের কারণে তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের একজন ধরা হয়।

বিশ্বকাপের পাতায় মেসির যত রেকর্ড

৬টি বিশ্বকাপ : কাতার বিশ্বকাপের পর এবার উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ আসরে মাঠে নামার মাধ্যমে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসি যৌথভাবে ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৬টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনন্য কীর্তি গড়তে যাচ্ছেন।

ম্যাচ ও মিনিটের রেকর্ড : বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২৬টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেসির দখলে। পাশাপাশি পাওলো মালদিনিকে ছাড়িয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় (২ হাজার ৩১৪ মিনিট) মাঠে খেলার রেকর্ডও তার।

অ্যাসিস্ট ও গোল : একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ৫টি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করার কীর্তি গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে ১৩টি গোল করে তিনি এখন আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা।

অনন্য তিন দশক : কিশোর বয়স, ২০ এর দশক এবং ৩০ এর দশক— এই তিন দশকেই বিশ্বকাপে গোল করা ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় মেসি।

গোল্ডেন বল : বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুবার (২০১৪ ও ২০২২) টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জিতেছেন মেসি। 

গত ৬২ বছরে কোনো দলই টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তবে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা এবার সেই রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায়। গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রক্ষণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং মিডফিল্ডে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও ম্যাক অ্যালিস্টারদের নিয়ে দলটি দারুণ শক্তিশালী।

আক্রমণভাগে জুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজের পাশাপাশি থিয়াগো আলমাদা এবং তরুণ ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোর উত্থান আলবিসেলেস্তেদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাদের পথ দেখানোর জন্য দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি তো আছেনই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *