নেতানিয়াহু অপমানিত ও ব্যর্থ যুদ্ধবাজ নেতায় পরিণত হয়েছে : রিপোর্ট

সংঘাত স্থগিত রাখা হবে বলে জানিয়েছে ইরান ও ইসরায়েল। উভয় দেশের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়েছে। ইসরায়েলে, ইরান ও হিজবুল্লাহর পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়। তবে ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে সামরিক নির্দেশ গ্রহণ করছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অনেকে। সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ২৪-এর প্রতিবেদক নোগা তারনাপলস্কি জেরুজালেম থেকে এসব তথ্য জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এই সংঘাতের কারণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেতানিয়াহু অপমানিত ও ব্যর্থ যুদ্ধবাজ নেতায় পরিণত হয়েছেন।

গত রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত ইরান ইসরায়েলের দিকে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর জবাবে ইসরায়েল ইরানের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে মঙ্গলবার থেকে এই পাল্টাপাল্টি হামলাগুলো আপাতত থেমেছে।

ইরান ও ইসরায়েল উভয় দেশই বলেছে, তাদের মধ্যে সংঘাত থেমে গেছে। তবে, আক্রান্ত হলে আবারও হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে উভয় দেশ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চূড়ান্ত আলোচনা এগিয়ে চলেছে, তবে যদি না অজ্ঞতা বা মূর্খতা এর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে এবং তা থামেনি। এখন থেকে এক বা দুই দিনের মধ্যে (চুক্তির ব্যাপারে) আমরা অন্তত একটি ধারণা পেতে পারি, তবে আমি মনে করি এটি ভালোভাবে এগোচ্ছে। ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ শতভাগ বলবৎ রয়েছে। আমাদের অবরোধ ডিঙিয়ে কোনো জাহাজ প্রবেশ করতে পারছে না। তাদের কোনো তেল নেই, কোনো আয় নেই, কিছুই নেই। অবরোধ ভেদ করে কিছুই ঢুকতে পারছে না।

জেরুজালেম থেকে ফ্রান্স-২৪ এর সংবাদদাতা নোগা তারনোপলস্কি জানান, এখন অত্যন্ত উত্তেজনার পর শান্ত অবস্থা। এখন এমন এক পরিস্থিতি, যার ওপর অন্তত ইসরায়েলের মানুষের আস্থা খুব কম, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে থাকা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর জন্য। দক্ষিণ লেবাননে থাকা ইসরায়েলি সৈন্যদের এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে থাকা ইসরায়েলি বসতিগুলোর ওপর ক্রমাগত পডশট (ককটেল) নিক্ষেপ করে চলেছে। ইসরায়েলও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। সুতরাং, সত্যিই এখন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ইসরায়েলের জনগণের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা যাচ্ছে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারবে কি না, তাদের কাজে যাওয়ার পরিকল্পনা করা উচিত কি না—এসব বিষয়ে মানুষের কোনো ধারণা নেই। এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা নিরাপত্তাহীনতা এবং দৈনন্দিনের বিপত্তির পর, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে মানুষ ব্যবসা করতে পারছে না। মাত্র দুদিন আগেও ইসরায়েলের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডের মানুষ বোমা আতঙ্কে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল। এখন আবার হঠাৎ করে লোকজনকে বলা হচ্ছে, ‘ঠিক আছে, সব (যুদ্ধ) শেষ’। সাম্প্রতিক পুরো একদিনের ছোটখাটো যুদ্ধটা কী নিয়ে ছিল বা ইসরায়েল এতে কী লাভ করেছে, সে সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়নি। আর এটা ইসরায়েলিদের মধ্যে এক চরম অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।

এদিকে, লেবাননের টায়ার শহর থেকে লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখনও লড়াই চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টার মাঝে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফ্রান্স-২৪ এর সংবাদদাতা নোগা তারনোপলস্কি আরও জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সম্ভবত হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আর তাই, তিনি ইরানের সঙ্গে প্রকৃত আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন, যা তিনি যুদ্ধের আগেও করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু লেবাননের দক্ষিণ এবং ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে প্রক্সি যুদ্ধ হয়। আর তাই ইরান মিত্র হিজবুল্লাহকে বলতে পারে, তোমরা এখন গুলি চালানো বন্ধ করো। তোমাদের যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে হবে। অথবা বলতে পারে, তোমরা যা ইচ্ছা তাই করো।

ইরান এই সীমান্ত এলাকাটিকে ক্রমাগত ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যাতে ইসরায়েলকে লেবাননে বড় ধরনের অভিযানে উসকানি দিয়ে সফল হওয়া যায়। এই যুদ্ধের সময় ইরানের সবচেয়ে বড় চালটি ছিল—‘আমরা ইসরায়েলে হামলা করেছি, কারণ তারা দক্ষিণ বৈরুতের হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছিল।’ মূলত, ইরান লেবাননের রাজধানীর ওপরেও এক ধরনের সার্বভৌমত্ব দাবি করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়টি সরাসরি না বললেও মেনে নিয়েছে, তা সত্যিই যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। সুতরাং, এই সীমান্ত এলাকায় শিগগিরই শান্তি আশা করা যায় না।

ফ্রান্স-২৪ এর সংবাদদাতা নোগা তারনোপলস্কি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক ধূর্ত নেতানিয়াহু নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর অভিযোগ ছিল। অন্যদিকে, ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর অবস্থানকে এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বারা একটি চরম অপমান হিসেবে দেখা হচ্ছে, যিনি এই মুহূর্তে মূলত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সামরিক নির্দেশ দিচ্ছেন। সত্যিই এখন এক আকর্ষণীয় বৈপরীত্য চলছে। এখন দেখা যাচ্ছে উভয় দেশের নেতারা কোনোভাবে ইরান যুদ্ধে যে একটি সত্যিকারের বিপর্যয় ঘটেছে, তার দায় থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন।

ইসরায়েলের জন্য, সম্ভবত লেবাননে এক জটিল পরিস্থিতি। সুতরাং, ইসরায়েলে মূল বিষয়টি হলো—নেতানিয়াহুকে আর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান বলে মনে হচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প বললে তিনি যুদ্ধ থামান। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইশারা দিলে তিনি আরও কিছুটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাকে একজন চূড়ান্তভাবে অপমানিত, ব্যর্থ যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন যুদ্ধবিরোধী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনে লড়েছিলেন। তিনিও এখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন—গ্যাসের দাম বাড়ছে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার তার ঘোষিত লক্ষ্যটি এই মুহূর্তে অলীক স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। তিনিও একটি উপায় খুঁজছেন। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আরও বেশি তথ্য ফাঁস হয়েছে, যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইসরায়েলই তাকে যুদ্ধেরর মধ্যে টেনে এনেছে। এই দুই নেতার মধ্যে শক্ত জোটের কাঠামোটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *