তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ : পানিসম্পদ মন্ত্রী

পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, তিস্তা নদীর স্থায়ী সমাধান এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং এ লক্ষ্যে চীনের কারিগরি সহযোগিতা ও পূর্ণ সমর্থন পাওয়া গেছে।

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, নদীভাঙন, পানির সংকট এবং বন্যা— এই তিন সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে দেশের লাখো মানুষ। তিস্তা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘নদীভাঙনের শিকার মানুষ বাজেট বোঝে না, তারা শুধু বাঁচতে চায়। প্রতিটি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও নদীভাঙন হচ্ছে। এই মানুষের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’ তিনি জানান, গত ১৯ জুলাই তিস্তা পাড় পরিদর্শনের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে তিস্তা অববাহিকার মানুষের কাছে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরতে বলেন।

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকার চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেবে।

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘তিস্তা পাড়ের ২ কোটি মানুষকে আশ্বস্ত করে আসবেন— মহাপরিকল্পনা বা যে নামেই হোক, আমরা এই অর্থবছরেই এটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাব।’

পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে তিনি সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় আইনসভা এবং সর্বশেষ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট, যিনি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং এ বিষয়ে গ্রন্থও রচনা করেছেন, তিনি বাংলাদেশের তিস্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

মন্ত্রী বলেন, চীন সরকার শুধু তিস্তা প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়নেও পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি আরও জানান, চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে এবং প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শুরু হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দ্রুত সমীক্ষা শেষ করে বিশ্বমানের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে আমরা বিশ্বমানের তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাব।’ বক্তব্যে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকার ইতোমধ্যে নিয়েছে এবং দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় ওই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

মন্ত্রী বলেন, পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত মাথাভাঙ্গা, ইছামতি, বারাসিয়া ও অন্যান্য নদী-খালের প্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, নৌ-যোগাযোগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, নদীভাঙন প্রতিরোধে গত চার মাসে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

এছাড়া সরকার দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে প্রয়োজনে এ কর্মসূচি ২৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, খাল পুনঃখনন শুধু পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করবে না; বরং সেচব্যবস্থা, গ্রামীণ যোগাযোগ, কৃষি উৎপাদন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করবে। তিনি সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সুফলের কথাও তুলে ধরেন। নিজের নির্বাচনি এলাকার এক উপকারভোগী মায়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রতি মাসে পাওয়া আড়াই হাজার টাকা কীভাবে ব্যয় করবেন জানতে চাইলে ওই নারী জানান, ১ হাজার টাকা পরিবারের চিকিৎসার জন্য, ১ হাজার টাকা দুই সন্তানের শিক্ষা ব্যয়ের জন্য এবং বাকি ৫০০ টাকা সঞ্চয় করবেন।

মন্ত্রী বলেন, এই উত্তরই প্রমাণ করে যে, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনছে এবং সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবেই পরিকল্পনা করছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষের কল্যাণ। নদীভাঙন রোধ, সেচ সম্প্রসারণ, খাল পুনঃখনন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *