জেএমবির আস্তানায় অভিযান, আরিফ ধরা পড়লেও পালিয়েছে ‘বোমারু মামুন’

সাভারের আশুলিয়ায় অভিযান চালানো বাড়িটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর আস্তানা ছিল বলে জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। রাতভর পরিচালিত অভিযানে সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য আরিফকে আটক করা হয়েছে। এ সময় বাড়িটি থেকে পাইপ বোমা, গানপাউডার, সায়ানাইডসহ বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এসব বিস্ফোরক দিয়ে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা চলছিল বলেও জানিয়েছে সিটিটিসি। আটক আরিফ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী এলাকার বাসিন্দা।

সম্প্রতি সাভারের আশুলিয়া ও রাজধানীর মতিঝিলে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নেমে দুজনকে শনাক্ত করে সিটিটিসি। তাদের মধ্যে মঙ্গলবারের (১১ আগস্ট) অভিযানে সাভারের আস্তানা থেকে আরিফকে আটক করা হলেও মূলহোতা ও বোমারু মামুন- নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’ এখনও ধরা পড়েনি।

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ড্রাইভিং ও শিক্ষকতার ভুয়া পরিচয় দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে গত ২ আগস্ট বাড়িটির নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেন আরিফ।

আরিফের সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় লুকানো ছয়টি শক্তিশালী পাইপ বোমা ও বিভিন্ন কেমিক্যাল উদ্ধার করা হয়। পরে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও ৯টি পাইপ বোমা, গানপাউডার, সায়ানাইড ও বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। অভিযান শেষে মোট ১৫টি পাইপ বোমা নিষ্ক্রিয় করে আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

প্রায় চার ঘণ্টা বাড়িটি ঘিরে রাখার পর মঙ্গলবার রাতে সাভারের শ্যামপুর এলাকায় আব্দুল জলিলের বাড়িতে অভিযান চালায় সিটিটিসি।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, পুরো এলাকা ঘিরে রেখে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সফলভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করেছে। আটক আরিফের কাছ থেকে জেএমবির বিপুল পরিমাণ দাওয়াতি ও সাংগঠনিক লিফলেটও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা সব বোমা ইতোমধ্যে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।

বাড়ির মালিক আব্দুল জলিলের মেয়ে ইলমা বলেন, গত ২ আগস্ট বাসাটি ভাড়া দেওয়া হয়। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, স্বামী-স্ত্রী থাকবেন এবং পাশের একটি স্কুলে বাচ্চাদের পড়াবেন। পরিবার নিয়ে থাকবেন ভেবে আমরা বাসা ভাড়া দিয়েছিলাম। ভেতরে ভেতরে তিনি যে এতটা ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করছিলেন, তা আমরা বুঝতে পারিনি।

অভিযানের পর থেকে বাড়িটিকে ঘিরে প্রতিবেশীদের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। গত ৩১ জুলাই ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। 

এর আগে রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি বোমা উদ্ধার করে সিটিটিসি। এই দুটি ঘটনার যোগসূত্র, বোমার উৎস, নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি এর পেছনে কোনো উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিবিড়ভাবে তদন্ত শুরু করে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। পাশাপাশি এসব ঘটনার ছায়া অনুসন্ধানে নামে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)।

ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ও দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা আলোচিত জঙ্গি সদস্যদের অনেকেই মুক্তি পায়। তাদের অনেকেই কারাগার থেকে পালিয়ে বা মুক্ত হয়ে সক্রিয় হয়ে ছোট ছোট সেল গঠন করেন। নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়নের উৎস তৈরি এবং বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেন।

গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রার পথে শক্তিশালী ছাতাবোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে আলোচিত নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’কে শনাক্ত করে পুলিশ।

২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় তিনি নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও শুরা সদস্য ছিলেন। ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথের ‘হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল’-এ আস্তানা গড়েছিল নব্য জেএমবির সদস্যরা।

সিটিটিসি হোটেলটিতে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ নামে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাইফুল ইসলাম নামের এক মূল হামলাকারী নিহত হন। ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট ওই সন্ত্রাসী হামলা মামলার অভিযোগপত্রে এবং পুলিশের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও বোমারু মামুনের নাম ছিল।

তদন্তকারীদের দাবি, জঙ্গি সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ, বিস্ফোরক তৈরি, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন মামুন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মামুন কারাগার থেকে বের হয়ে কেরানীগঞ্জ ও সাভারে বসবাস শুরু করেন। তার সঙ্গে শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফসহ অন্তত ১৫ জন যোগ দেন। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করে বোমা তৈরির সরঞ্জাম, অর্থ ও জনবল সংগ্রহের কাজ পুরোদমে শুরু করেন বলেও জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।

অভিযানের বিষয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানোর কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *