ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালকে ঘিরে উত্তেজনা এখন আকাশ ছোঁয়া! একদিকে দুর্দান্ত আক্রমণভাগ নিয়ে টানা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে এগিয়ে চলেছে ফ্রান্স, অন্যদিকে গোটা টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। দুই ভিন্নধর্মী শক্তির এই লড়াইকে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর এই মহারণের আগে আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়ে রেখেছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল।
কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারানোর পর ইয়ামাল বলেন, ‘এ জয়ে আমি ভীষণ খুশি। আবারও সেমিফাইনালে পৌঁছালাম (২০১০ সালের পর)। আমরা তো এই ম্যাচগুলো খেলতে আর জিততেই এসেছি। এখন একটু বিশ্রাম নেওয়া আর ফ্রান্সের ম্যাচ নিয়ে ভাবার সময়। এখানে সম্ভাবনা দুটি, হয় তারা টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে, না হয় আমরা তাদের টানা তিনবার হারাব। জানি না কী হবে, তবে আমরা মোটেও ভয় পাচ্ছি না।’
ইয়ামালের আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও। ফ্রান্সের বিপক্ষে সর্বশেষ দুই ম্যাচেই জয় পেয়েছে স্পেন। ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে ২-১ ব্যবধানে জয় পাওয়ার পর ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগেও ৫-৪ গোলের রোমাঞ্চকর ব্যবধানে ফরাসিদের হারিয়েছিল তারা। ফলে এবার সেমিফাইনালে জয় পেলে টানা তৃতীয়বারের মতো ফ্রান্সকে হারানোর কীর্তি গড়বে স্পেন।
এই ম্যাচটি ইয়ামালের জন্য ব্যক্তিগতভাবেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ১৩ জুলাই তার জন্মদিন। ১৯ বছরে পা দেওয়ার আগেই তিনি বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ ম্যাচ খেলে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। এর আগে ১৯৮২ বিশ্বকাপে ১৯ বছর হওয়ার আগে পাঁচটি ম্যাচ খেলে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নরমান হোয়াইটসাইড।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে মাঠে নামার মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ সেমিফাইনালিস্ট হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করবেন ইয়ামাল। ম্যাচের দিন তার বয়স হবে ১৯ বছর ১ দিন। এই তালিকায় শীর্ষে আছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে, যিনি ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনাল খেলেছিলেন মাত্র ১৭ বছর ২৪৪ দিন বয়সে এবং সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিকও করেছিলেন। দ্বিতীয় স্থানে আছেন ইতালির জুসেপ্পে বার্গোমি, যার বয়স ছিল ১৮ বছর ১৯৮ দিন।
তাইতো এবার জন্মদিনের উপহারের অপেক্ষায় আছেন স্প্যানিশ এই তারকা। জয় দিয়েই রঙিন করতে চান জন্মদিন। তার আগে স্পেনের বিপক্ষে প্রতিপক্ষগুলোর রক্ষণাত্মক কৌশলের কথাও তুলে ধরেছেন ইয়ামাল। তার মতে, প্রতিপক্ষের এই পরিকল্পনাই অনেক সময় স্পেনের কাজ কঠিন করে তোলে।
ইয়ামাল বলেন, ‘কোনো দলই আমাদের সঙ্গে আক্রমণাত্মক খেলেনি। তারা সবাই রক্ষণাত্মক খেলেছে, রক্ষণভাগে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থেকেছে, এমন কৌশল আমাদের কাজটা আরও কঠিন করে তুলেছিল। দিনশেষে আমরাই জিতেছি। আমার মনে হয়, ফ্রান্স যদি কাউকে ভয় পেয়ে থাকে, তবে আমাদেরই পাওয়া উচিত। আমরাই তাদের ইউরো থেকে বিদায় করেছিলাম। অবশ্যই আমরা দুটিই অসাধারণ দল। আমার মতে, এ বিশ্বকাপের সেরা দুটি দল হলাম আমরা। দেখা যাক কী হয়, তবে আমরা মোটেও ভয় পাচ্ছি না।’
চোট কাটিয়ে বিশ্বকাপে ফিরলেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গোল করতে পেরেছেন ইয়ামাল। তবে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের চেয়ে দলীয় সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে স্প্যানিশ উইঙ্গার বলেন, ‘আমি গোল করতে চেয়েছিলাম, কারণ এটি দলকে সাহায্য করে। কিন্তু আমি মাঠে শুধু গোল করার কথা ভেবে নামি না। যদি বিশ্বকাপ জিতি, মনে হয় না কেউ মনে রাখবে আমি কয়টি গোল করেছি বা মিস করেছি। জিতলে খুশি হব সবাই। ম্যাচসেরার পুরস্কারটা বোনাস।’
গোল না করেও পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন ইয়ামাল। তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘জানি আমার দৌড়গুলো অনেক প্রতিপক্ষকে টেনে আনে, আর এই সুযোগে কোনো সতীর্থ ফাঁকায় চলে আসতে পারে। আসল ব্যাপার হচ্ছে, আমরা এখানে জিততে এসেছি। দলের জয়ে আমি যেভাবে সাহায্য করতে পারি-এমনকি বল স্পর্শ না করেও যদি সাহায্য করা যায় সেটাও দারুণ হবে।’
নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন এই তরুণ তারকা। গত ইউরোতেও মাত্র একটি গোল করেই শিরোপা জিতেছিল স্পেন। সেই স্মৃতি টেনে ইয়ামাল বলেন, ‘গোল না পাওয়ার ব্যাপারটাই সবার মাথায় জেঁকে বসেছে। আমরা যখন ইউরো জিতেছিলাম, তখনো আমি মাত্র একটি গোল করেছিলাম। এই বিশ্বকাপেও একটি করে ফেলেছি। তাই সবাই নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন!’
বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে তাই শুধু দুই ফুটবল পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়াই নয়, এটি হতে যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস, সাম্প্রতিক ইতিহাস এবং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের আগে স্পেন স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে- ফ্রান্সকে তারা ভয় পাচ্ছে না, বরং টানা তৃতীয়বারের মতো হারানোর লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে।
ফ্রান্স-স্পেন ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায়!
এসএন/পিডিকে