যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে মধ্যস্থতাকারীরা, কারণ নির্ধারিত সময়সীমার আগে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছিল; যেমন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং তেহরানের আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ।
তবে সপ্তাহান্তে আলোচনার পরিবেশ বদলে যায়। এক তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, আলোচনায় একাধিক জটিল বিষয় রয়েছে, কিছু এগোলেও অন্যগুলোতে মতপার্থক্য এতটাই গভীর যে সমাধান কঠিন।
আরেকটি সূত্র জানায়, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়াতে আগ্রহী এবং আশা করছেন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কোনো সমাধান আসতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও সময় বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে তুরস্কের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাস্তব, আর তা হলে আরও ভয়াবহ সংঘাত শুরু হতে পারে।
আলোচনায় যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, তার মধ্যে ছিল—ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাকিস্তানে স্থানান্তর, কয়েক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন নিয়ম, ইরাক ও লেবাননে মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আংশিক নিরস্ত্রীকরণ এবং একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ও ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া।
সবচেয়ে বড় মতবিরোধের একটি হলো, সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার সময়কাল। কেউ বলছে পাঁচ বছর, কেউ বলছে ১২ বছর; আর যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ২০ বছরের প্রস্তাব দিয়েছিল।
আলোচনায় জড়িত সূত্রগুলো বলছে, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পুরো মজুত পাকিস্তানে পাঠাতে প্রায় সম্মত হয়েছিল। পাকিস্তান প্রস্তাব দিয়েছিল এটি তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর, যা ইরান নীতিগতভাবে মেনে নেয়। পরে ইরান নিজেই পাকিস্তানকে গন্তব্য হিসেবে প্রস্তাব করে এবং ইসলামাবাদ তা গ্রহণ করে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে আরও রয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেবে, তবে ওমানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে টোল আরোপ করবে। যুদ্ধজাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ হতে পারে, যা ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আর চ্যালেঞ্জ করা হবে না এবং প্রতিটি জাহাজ চলাচলের জন্য অনুমতি নিতে হবে।
বিনিময়ে ইরানের ওপর সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া হবে।
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে।
সপ্তাহান্তে উত্তেজনা আবার বেড়ে যাওয়ায় অগ্রগতি থমকে যায়। ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় তারা আবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে, যদিও কয়েকদিন আগে তা খুলে দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন এবং সতর্ক করে বলেন, চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘পুরো দেশ ধ্বংস করে দিতে পারে’।
এদিকে ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ চলতে থাকলে তারা পাকিস্তানে আলোচনায় অংশ নাও নিতে পারে।
চুক্তি হলে উভয় পক্ষই তা নিজেদের মতো করে তুলে ধরবে। ইরান মনে করে, সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে বন্ধ করা বড় কোনো ছাড় নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখাবে।
২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তিতে আন্তর্জাতিক তদারকির মধ্যে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
আলোচনার আরেকটি জটিল বিষয় হলো, ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) আংশিক ভেঙে দেওয়া হবে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর আক্রমণাত্মক অস্ত্র নিরস্ত্র করা হবে।
কিছু সূত্র বলছে, হিজবুল্লাহ আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র রাখতে পারবে, কিন্তু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রধান অস্ত্রগুলো সরিয়ে নিতে হবে। তবে ইরান এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এসব গোষ্ঠীর ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
লেবানন নিয়ে অনেকেই সন্দিহান, এই ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্ভব কি না। একটি সূত্র বলেছে, ‘হিজবুল্লাহ কখনোই তাদের আক্রমণাত্মক অস্ত্র ছাড়বে না।’
আরেকটি অনিশ্চয়তা হলো, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো এই চুক্তিতে একমত কিনা। কেউ বলছে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্মতি দিয়েছেন, আবার কেউ বলছে তিনি গুরুতর আহত এবং যোগাযোগে অক্ষম।
এছাড়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। একটি চুক্তি যদি ইরানকে ক্ষমতায় রেখে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অক্ষুণ্ণ রেখে এবং সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ না করে, তাহলে তা ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ করবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের চুক্তি হলে ইসরায়েলের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনের বছরে।
এদিকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ যেগুলো যুদ্ধের সময় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে তারা হামলার বিরোধিতা করলেও পরে তারা চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র যেন আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
সব মিলিয়ে আলোচনার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত আর যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, সেটিও নির্ভর করছে পরবর্তী কয়েক দিনের ওপর।
এসএন/পিডিকে