ক্রোয়েশিয়ার লক্ষ্য সোনালি ট্রফিতে মদ্রিচকে বিদায় দেওয়া

মরুর বুকে ব্রোঞ্জের আলো ছড়িয়ে কাতার বিশ্বকাপ রাঙানোর পর, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল হিসেবে বলকান অঞ্চলের দেশ ক্রোয়েশিয়া এবার পা রাখছে উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে। কয়েক দশক ধরে যুগোস্লাভিয়ার অধীনে থাকার পর স্বাধীনতা পেয়েই বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের সামর্থ্যের চেয়েও যেন বহুগুণ বেশি আলো ছড়িয়ে চলেছে ৪০ লাখেরও কম জনসংখ্যার এই ছোট্ট দেশটি।

১৯৯৮ সালে নিজেদের অভিষেক আসরেই ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে তৃতীয় স্থান অধিকার করা ক্রোয়েশিয়া এখন আর কোনো ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চের আসল রাজা। ২০১৮ সালের রানার্স-আপ এবং ২০২২ সালের ব্রোঞ্জজয়ীরা এবার উত্তর আমেরিকার সবুজ গালিচায় নামছে তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুকুটটি ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে।

ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড জালাতকো দালিচ

টানা তৃতীয়বারের মতো ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত ২০১৭ সালে কোনো চুক্তি ছাড়াই দলের দায়িত্ব নেওয়া মাস্টারমাইন্ড জালাতকো দালিচ। অভিজ্ঞ ও তরুণদের এক অনবদ্য মিশ্রণে স্কোয়াড সাজাতে ওস্তাদ দালিচ এবারও মদ্রিচ, পেরিসিচ বা ক্রামারিচের মতো চেনা সেনানায়কদের পাশে জায়গা করে দিয়েছেন ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লুকা ভুশকোভিচ কিংবা তরুণ ইগর মাতানোভিচদের। দালিচের এই দল যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম।

বাছাইপর্বে অপরাজেয় ক্রোয়েশিয়া

উয়েফা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ‘এল’ গ্রুপে অপ্রতিরোধ্য ছিল ক্রোয়েশিয়া। আট ম্যাচের মধ্যে ৭টিতেই জয় তুলে নিয়েছিল তারা। আর একটি ম্যাচে করেছিল ড্র। বিশ্বমঞ্চের টিকিট কাটতে প্রতিপক্ষদের রীতিমতো গোলবন্যায় ভাসিয়েছে ক্রোয়াটরা। এই আট ম্যাচে তারা গোল করেছে ২৮টি। সর্বোচ্চ জয় ছিল ৭-০ ব্যবধানের। এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত করেছিল বিশ্বকাপের টিকিট।

২০২৬ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ সূচি

ইউরোপ, মধ্য আমেরিকা এবং আফ্রিকার ভিন্ন ভিন্ন মহা দেশের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করতে হবে ক্রোয়াটদের। ১৭ জুন ডালাস স্টেডিয়ামে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে ক্রোয়েশিয়া। ২৩ জুন টরন্টো স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ মধ্য আমেরিকার দেশ পানামা। ২৭ জুন ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ঘানার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে ক্রোয়াটরা। 

পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস

জালাতকো দালিচ বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে অভিজ্ঞতার খনির সঙ্গে তরুণ প্রতিভার দারুণ এক ভারসাম্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। কাতার বিশ্বকাপের পেনাল্টি শুটআউটের নায়ক ডমিনিক লিভাকোভিচই থাকছেন পোস্টের নিচে মূল ভরসা। ব্যাক-আপ হিসেবে তৈরি থাকছেন কোতারস্কি ও পান্দুর।

চোট কাটিয়ে সম্পূর্ণ ফিট হয়ে জোশকো গভার্দিওলের দলে ফেরা ক্রোয়াট ডিফেন্সে দারুণ শক্তি বাড়াবে। সেই সঙ্গে তরুণ ভুশকোভিচের অন্তর্ভুক্তি রক্ষণভাগের গভীরতা আরও বাড়িয়েছে।

মদ্রিচ-কোভাচিচ জুটির মাঝমাঠের রসায়ন যেকোনো বড় দলের চিন্তার কারণ। সঙ্গে বাটুরিনা ও পেতার সুচিচের মতো তরুণদের গতিময় ঝলক মাঝমাঠকে দারুণ গতিশীল করে তুলবে। আক্রমণভাগে বাছাইপর্বের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রামারিচ ও অভিজ্ঞ পেরিসিচই গোলের মূল দায়িত্ব সামলাবেন।

স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা

উয়েফা বাছাইপর্বের ৮ ম্যাচের ৭টিতেই জয় পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। এই ম্যাচগুলোতে ২৬টি গোল দেওয়ার অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিয়ে মূল পর্বে এসেছে ক্রোয়েশিয়া। এখন পর্যন্ত যতগুলো বিশ্বকাপে তারা খেলেছে, তার অর্ধেকবারই শেষ চারে পৌঁছানোর এক অলৌকিক ও অনন্য মানসিক শক্তি রয়েছে এই দলের। বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই হলেও মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মদ্রিচ এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এগুলো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।

তবে এই দলের দুর্বলতাগুলোও সেই অভিজ্ঞ ফুটবলারদের ঘিরেই। দলের মূল চালিকাশক্তি মদ্রিচ বা পেরিসিচদের বয়স টুর্নামেন্টের দীর্ঘ ও হাই-ইনটেনসিটি ম্যাচে ফিটনেসের বড় পরীক্ষা নেবে। এছাড়া নকআউট পর্বে বারবার ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে বা পেনাল্টি শুটআউটে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ফুটবলারদের ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে দিতে পারে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে অভিষেক আসরেই জার্মানির মতো পরাশক্তিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বফুটবলে রূপকথার জন্ম দিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপে শিরোপার কাছে গিয়েও ফিরেছিল রানার্সআপ হয়ে।

স্মরণীয় যত রেকর্ড

সর্বোচ্চ গোলদাতা : ১৯৯৮ বিশ্বকাপের নায়ক দাভর সুকার এবং ইভান পেরিসিচ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা। তারা দুজনই ৬টি করে গোল করেছেন। পেরিসিচের সামনে এবার সুযোগ থাকছে এককভাবে এই মুকুট নিজের করার।

মদ্রিচের অনন্য কীর্তি : চারটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে ১৯টি ম্যাচ খেলা লুকা মদ্রিচ ক্রোয়েশিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিক।

সবচেয়ে বড় জয় : ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ক্যামেরুনকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়।

২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য

জালাতকো দালিচের অধীনে লাল-সাদা চেক জার্সির এই ক্রোয়েশিয়া দলটি ভালো করেই জানে কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়তে হয়। লুকা মদ্রিচের শেষ বিশ্বকাপকে একটি সোনালী ট্রফি দিয়ে রাঙানোর লক্ষ্য তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে তৈরি এই দলের।

ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াড

গোলকিপার : ডমিনিক লিভাকোভিচ, ডমিনিক কোতারস্কি ও ইভোর পান্দুর।

ডিফেন্ডার : জোশকো গভার্দিওল, দুয়ে চালেতা-কার, জোসিপ সুতালো, জোসিপ স্টানিসিচ, মারিন পংগ্রাসিচ, মার্টিন এরলিচ ও লুকা ভুশকোভিচ।

মিডফিল্ডার : লুকা মদ্রিচ (অধিনায়ক), মাতেও কোভাচিচ, মারিও পাসালিচ, নিকোলা ভ্লাসিচ, লুকা সুচিচ, মার্টিন বাতুরিনা, ক্রিস্টিয়ান জাকিচ, পেতার সুচিচ, নিকোলা মোরো, টনি ফ্রুক।

ফরোয়ার্ড : ইভান পেরিসিচ, আন্দ্রেজ ক্রামারিচ, আন্তে বুদিমির, মার্কো পাসালিক, পিটার মুসা ও ইগোর মাতানোভিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *