ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাসী ও টোকাই দিয়ে হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল : শিবির সভাপতি

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে যারা হামলা করেছে, তারা প্রকৃত ছাত্র নয়, বরং ছাত্র সন্ত্রাসী ও টোকাই। ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে যাদের দিয়ে কমিটি দিয়েছে, তাদের অনেকের ছাত্রজীবন ১৫ থেকে ২০ বছর আগেই শেষ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আজ বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মিছিল শেষে আয়োজিত সমাবেশে শিবির সভাপতি এসব কথা বলেন।

নূরুল ইসলাম বলেন,  এসব ‘আদুভাই’ দিয়ে ক্যাম্পাসের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ থেকে ভাড়া করা টোকাই সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পাসে আনা হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়ায় সশস্ত্র হামলা চলানো হয়। রাতে ঢাকা গ্রাফিক্স আর্টস কলেজের ঘুমন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর অভিযোগও করেন তিনি।

নূরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের লাগাম না ধরা হলে এবং বিএনপির টোকাই বাহিনীর লাগাম না টানা হলে রাজপথে তাদের সন্ত্রাস প্রতিহত করা হবে। তিনি আরও বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। বারবার তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে ক্যাম্পাস শান্ত রাখার কথা বলা হচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছ, পূর্বের ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্ত ফিরিয়ে আনতে তারা ক্যাম্পাসগুলোতে আবার হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চায়।

শিবির সভাপতি প্রধানমন্ত্রীকে এই ‘সন্ত্রাসী দলের’ লাগাম টেনে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসীদের লাগাম টানতে ব্যর্থ হলে ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রজনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি সন্ত্রাসীর লাগাম টেনে ধরবে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সহনশীলতা দুর্বলতা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নূরুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বারবার বলা হলেও এবং ডিএমপি পুলিশ কমিশনার সন্ত্রাস কর্মকাণ্ড বন্ধের আশ্বাস দিলেও হামলাকারীদের হাতে চাপাতি, গ্রিজ, কোদাল ও রিভলভার দেখা গেছে। তাদের পাশে পুলিশ অবস্থান করেছে এবং ছাত্রলীগকে যেভাবে শেল্টার দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ বাহিনী আবারও নব্য ফ্যাসিবাদের আশ্রয়দাতায় পরিণত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শিবির সভাপতি বলেন, প্রতিটি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান চলবে। এরপর কোনো ক্যাম্পাসে রক্ত ঝরলে এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। জাতীয় রাজনীতি উত্তপ্ত হলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি ফোঁটা রক্তের জবাব নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তিনি ভেবেছিলেন বিএনপির সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে। এবার শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ফিরে আসবে। সেখানে মেধার চর্চা ও গবেষণা হবে এবং আলোকিত মানুষ তৈরি হবে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড মনে হচ্ছে, ক্যাম্পাসগুলো দখল করে পুনরায় চাঁদাবী আর টেন্ডারবাজীতে মেতে উঠতে চায়।

নূরুল ইসলাম আরও বলেন, এই শিক্ষার পরিবেশ জুলাই বিপ্লবের ফসল। ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে নিজেদের চরিত্র ও আদর্শ দিয়ে ছাত্রদলকে ধরাশায়ী করেছে এবং ছাত্রসমাজের সমর্থনের ভিত্তিতে তাদের পরাজিত করেছে। এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরাজয়কে আদর্শ দিয়ে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েই ছাত্রদল সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি সরকারকে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তাবায়নের জন্য আহ্বান জানান। অন্যথায় জনগণ আপনাদের বাধ্য করবে।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান পুলিশের আইজিপি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের উদ্দেশে অভিযোগ করেন, গতকাল পুলিশের পাহারায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর সন্ত্রাসী, গুন্ডা ও বহিরাগতরা ‘হায়নার মতো’ হামলা চালিয়েছে। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের আগের আইজি ও কমিশনারের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তারাও একই কাজ করেছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের রক্ষা করতে পারেননি।

রফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, ভারতের সেবাদাস শেখ হাসিনা জনতার আন্দোলনের মুখে কীভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ইতিহাস বর্তমান সরকারের জানা আছে। জানা না থাকলে জেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেই পরিণতি স্মরণে থাকলে এত দ্রুত এসব অপকর্মে জড়িত হওয়ার কথা নয়।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ভালো করেই চেনে। তারা জানে বলেই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল। ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে চলমান গণঅভ্যুত্থানকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে ইসলামী ছাত্রশিবির চরম ধৈর্য, সাহসিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে চলমান গণআন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে শেখ হাসিনার পতন ত্বরান্বিত করাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিল। 

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্রতিপক্ষের মূল কারণ মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নয়, বরং ছাত্রদল টেন্ডারবাজি করতে চায় এবং ছাত্রশিবির তা করতে দিতে চায় না। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টই এর ফয়সালা হয়ে গেছে। নতুন করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে ছাত্রদের মন দখল করা যাবে না এবং মেধা ও কোটার ভিত্তিতে কোনো হল তো দূরের কথা, একটি সিটও দখল করতে দেওয়া হবে না। 

শফিকুল ইসলাম মাসুদ আরও অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের ক্যাম্পাস দখলের মূল পরিকল্পনা শুধু ছাত্রশিবিরকে বের করে দেওয়া নয়, বরং ক্যান্টিনে ফাও খেয়ে ক্যান্টিনগুলোকে দেউলিয়া করার পরিকল্পনাও তারা বাস্তবায়ন করতে চায়। ৫ আগস্ট বিজয় উৎসব পালনের দিনে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে দাঁড়ানো বাংলাদেশের, বিএনপির এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য লজ্জার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে বাধ্য হয়ে তারেক রহমানকে নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তারেক রহমানকে ছাত্রদলকে সামলানোর আহ্বান জানিয়ে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ছাত্রদলকে সামলানো না হলে ছাত্রলীগ যেমন আওয়ামী লীগের পতন নিশ্চিত করেছে, এই ছাত্রদল তারেক রহমানের পতন আরও কম সময়ে নিশ্চিত করে তাকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করতে বাধ্য করবে।

ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহর সঞ্চালনায় আয়োজিত ছাত্র গণজমায়েতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, ঢাকা মহানগর শাখার নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনের বিপুলসংখ্যক জনশক্তিও সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *