রাজধানী ঢাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট এখনও কাটেনি। অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। যে দু-একটি স্টেশনে সরবরাহ মিলছে, সেখানেও চাপ এত কম যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস নিতে পারছেন না চালকরা। ফলে বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনের সামনে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সারি।
অপরদিকে, বাসাবাড়িতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও স্বস্তি ফেরেনি। শুক্রবার ও শনিবার অনেক এলাকায় চুলায় গ্যাস না এলেও রবিবার (১৬ আগস্ট) সকাল থেকে কিছু কিছু এলাকায় গ্যাস এসেছে। তবে চাপ এতটাই কম যে চুলা জ্বললেও তাতে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না।
সিএনজি স্টেশনের কর্মী, চালক ও গৃহিণীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নেই, দীর্ঘ অপেক্ষা
প্রাইভেটকার চালক সানাউল্লাহ বলেন, মালিবাগ থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বেশিরভাগ সিএনজি স্টেশনেই গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না। কখন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সেটিও জানাতে পারছেন না স্টেশন কর্তৃপক্ষ।
গ্যাস নেওয়ার আশায় দুপুর ১২টা থেকে মালিবাগে অপেক্ষা করছিলেন তিনি।
সানাউল্লাহ বলেন, গাড়িতে ঠিকমতো গ্যাস নিতে না পারায় গাড়ি চালাতেও পারছেন না। মাসে ৩০ হাজার টাকা চুক্তিতে রেন্ট-এ-কার হিসেবে গাড়ি চালান তিনি। কিন্তু গ্যাসের সংকটে নিয়মিত ট্রিপ দিতে না পারায় চলতি মাসের চুক্তির টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
হাজীপাড়া পাম্পের কর্মী আসাদ বলেন, গ্যাস কখন আসবে বলতে পারব না। সরবরাহ পেলেই গ্যাস দেওয়া শুরু হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড্ডা, মালিবাগ ও কমলাপুর এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। তেজগাঁও ও মহাখালীর অনেক স্টেশনেও একই অবস্থা। খিলক্ষেত এলাকায় কোথাও কোথাও গ্যাস দেওয়া হলেও চাপ খুবই কম।
প্রাইভেটকার চালক ইউনুস আলী বলেন, খিলক্ষেতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। তিনি বলেন, এটা আসলে হাওয়া। নাইনটি সিলিন্ডারে সাধারণত এক হাজার থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত গ্যাস ঢোকে। সেখানে ১২০ টাকার গ্যাস দিয়ে কী হবে?
তিনি বলেন, রাতে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো থাকে। তবে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ একেবারেই কম।
আকিজের পাম্পকর্মী তারেক বলেন, এখন আমরা বন্ধ রেখেছি। রাতে সরবরাহ পেলে গ্যাস দিতে পারব। গত রাতেও দিয়েছি। মিরপুর ও গাবতলী এলাকার পাম্পগুলোর অবস্থাও একই।
উত্তরা-আব্দুল্লাহপুরেও দীর্ঘ সারি
উত্তরা-আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশের খন্দকার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক বাস ও মোটরসাইকেল চালক ডিজেল ও অকটেন নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
মেসার্স মাসুদ হাসান স্টেশনের ম্যানেজার বলেন, পরিবহনের বড় একটি অংশ সিএনজিনির্ভর। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় বিক্রি বন্ধ রয়েছে এবং স্টেশনের সামনে গাড়ির লাইন বাড়ছে।
তিনি বলেন, আমরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। তিতাস আমাদের ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ করছে না। আমাদের কাছে না থাকলে আমরা কোথা থেকে দেব? আমাদের অধিকাংশ গ্রাহকের গাড়িই গ্যাসে চলে। গত এক সপ্তাহ ধরে পাম্পে গ্যাস পাচ্ছি না। ফলে বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা-আব্দুল্লাহপুর অংশের পশ্চিম পাশের আরএসআর ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে।
সিএনজি চালক মানিক বলেন, সকাল ৫টায় গ্যাসের জন্য আসছি। এখনো গ্যাস পাইনি। গাড়ির মালিককে জমা দেব কোথা থেকে? সংসার চালাব কীভাবে? সামনে মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে হবে। এখন কী করব জানি না।
চালকদের অভিযোগ, গ্যাসের সংকটে তাদের আয়-রোজগারও কমে গেছে। প্রতিদিনের গাড়ির জমা পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আরেক চালক জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিদিন মহাজনকে ১২০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাসে প্রায় ৪০০ টাকা খরচ হয়। এর বাইরে দৈনিক আরও ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ থাকে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় গত সাত দিন ধরে তার আয় বন্ধ।
মাসুদ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাকিব হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ নেই। আশপাশের সব ফিলিং স্টেশন বন্ধ। বিদ্যুৎ খরচ করে পাম্প চালালেও গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই।
চুলা জ্বলছে, রান্না হচ্ছে না
এদিকে রবিবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে কিছুটা গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তবে চাপ এত কম যে চুলা জ্বললেও স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
বনশ্রীর গৃহিণী কানিজ ফাতেমা বলেন, লাইনে যে গ্যাস আসছে, তাতে পানি গরম করে চাও খাওয়া যাবে না। পানি গরম করতেই ২০ মিনিট লাগছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় তিনি ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। সকালে রুটিও ইলেকট্রিক চুলায় তৈরি করেছেন বলে জানান তিনি।
বাড্ডার গৃহিণী আনোয়ারা বেগম বলেন, সকালে চুলা জ্বলেছে। কিন্তু সেই চুলায় রান্না বসালে কতক্ষণ লাগবে, বলা যায় না। চুলা জ্বললেও রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। শুক্রবার-শনিবার তো চুলাই জ্বলেনি।
মিরপুরের গৃহিণী আফরোচা বেগম বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি।
রাজধানীর উত্তরা, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়েও গ্যাস সংকটের একই চিত্র পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ কোথাও চুলা পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও আবার চুলা জ্বলছে নামমাত্র—কিন্তু সেই আগুনে রান্নার হাঁড়ি বসানোর মতো চাপ নেই।
এসএন/পিডিকে