বাংলাদেশে কর ফাঁকি শনাক্ত ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এতদিন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান ভরসা ছিল করদাতার নিজস্ব ঘোষণাপত্র, কাগজপত্র যাচাই এবং কর কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান। নতুন পরিকল্পনায় সেই চিরাচরিত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চায় সংস্থাটি। করদাতা কী আয় দেখালেন, ব্যাংকে কত টাকা জমা হলো, কত দামের গাড়ি কিনলেন, কতবার বিদেশে গেলেন, কোথায় জমি বা ফ্ল্যাট কিনলেন, শেয়ারবাজারে কত বিনিয়োগ করলেন কিংবা শিক্ষা ও চিকিৎসায় কত ব্যয় করলেন; সব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় এনে মিলিয়ে দেখার পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
একইসঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কেবল হিসাবের খাতায় দেখানো বিক্রয় ও মুনাফার ওপর নির্ভর করতে চায় না রাজস্ব প্রশাসন। একটি কোম্পানি কত কাঁচামাল আমদানি করেছে, স্থানীয়ভাবে কত কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে, তার উৎপাদন সক্ষমতা কত, বাজারে তার অংশীদারত্ব কত এবং সেই তুলনায় সে কত টাকা কর ও ভ্যাট দিচ্ছে; এসব তথ্যও পর্যালোচনার আওতায় আনা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যক্তি থেকে করপোরেট; রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে এনবিআরের নতুন কৌশলের মূল কথা হলো তথ্য মিলিয়ে অসঙ্গতি খুঁজে বের করা।
এই কৌশল সফল হলে কর প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে এখানেই। কারণ, করদাতা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু কী তথ্য দিতে বলা হলো, সেটি নয়; বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও উৎসের কাছে থাকা তথ্য একত্র করে সেই তথ্যের সঙ্গে করদাতার ঘোষণার মিল আছে কি না, সেটিই হবে নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। এনবিআরের নতুন পরিকল্পনার এই তথ্যসমন্বয়ই কি তাহলে কর আদায় বাড়ানোর সেই বহুল প্রত্যাশিত ‘জাদুর চাবিকাঠি’?
ঘোষিত আয় বনাম প্রকৃত জীবনযাত্রা
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের জন্য একটি সমন্বিত বা ইন্টিগ্রেটেড প্রোফাইল তৈরি করা হবে। এতে আয়কর রিটার্নে ঘোষিত তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের লেনদেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, জমি-ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ির মালিকানা, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়, ভাড়া থেকে আয়সহ বিভিন্ন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে।
উদাহরণ হিসেবে এনবিআরের পরিকল্পনায় এমন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে কোনো ব্যক্তি বছরে ১২ লাখ টাকা আয় ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তাঁর ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, তিনি ৫০ লাখ টাকার গাড়ি কিনেছেন, ১ কোটি টাকার জমি কিনেছেন এবং বছরে কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ঘোষিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে এই ধরনের বড় ব্যবধান নতুন ডেটা ম্যাচিং ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করার কথা।
বর্তমান ব্যবস্থায় এ ধরনের অসঙ্গতি শনাক্ত করতে কর্মকর্তাদের আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও নথি যাচাই করতে হয়। ফলে জনবল, সময় ও তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক করদাতাকে কার্যকরভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পদ্ধতিটি হবে উল্টো। কোটি কোটি তথ্যের মধ্যে প্রযুক্তি প্রথমে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন ও জীবনযাত্রার ধরন চিহ্নিত করবে। এরপর কর্মকর্তারা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ করদাতাদের ওপর বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। এটিই মূলত ঝুঁকিভিত্তিক কর প্রশাসন।
নতুন ব্যবস্থার ‘জাদুর চাবিকাঠি’ কোথায়?
বাংলাদেশে কর প্রশাসনের বড় সমস্যা করের হার নয়, বরং করজালের বাইরে থাকা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করতে না পারা—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দেন, কিন্তু প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় কম কর দেন বলে সন্দেহ রয়েছে। আবার কারও টিআইএন আছে, কিন্তু বছরের পর বছর রিটার্ন দিচ্ছেন না। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও অনেকেই কর ব্যবস্থার আওতার বাইরেই রয়ে গেছেন।
এনবিআরের নতুন পরিকল্পনায় এই চারটি বিষয় আলাদাভাবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। তারা হলেন, নিয়মিত রিটার্ন ও কর প্রদানকারী সক্রিয় করদাতা; রিটার্ন দিলেও কর দেন না এমন ব্যক্তি; টিআইএন থাকলেও রিটার্ন দেন না এমন ব্যক্তি; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও টিআইএন নেই এমন ব্যক্তি। এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে একটি সক্রিয় করদাতা রেজিস্ট্রি তৈরির পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
বিশ্লেষকদের মতে, কর প্রশাসনের আসল শক্তি হতে পারে এখানেই। কারণ, নতুন করদাতা খুঁজে বের করার জন্য শুধু প্রচার চালিয়ে মানুষকে কর দিতে উৎসাহিত করলেই হবে না। বরং যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বাস্তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, তাদের নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, করদাতা খুঁজতে আর শুধু করদাতার দরজায় যেতে হবে না; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য থেকেই সম্ভাব্য করদাতাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে এনবিআর।
ব্যক্তি করদাতার পর এবার করপোরেটের ‘ডেটা অডিট’
কর ফাঁকির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে। একটি কোম্পানি প্রকৃতপক্ষে কত উৎপাদন করছে, কত বিক্রি করছে এবং সেই তুলনায় কত রাজস্ব দিচ্ছে—এ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর সবসময় পাওয়া সহজ নয়। এ কারণেই করপোরেট আয়কর ফাঁকি রোধে এনবিআর একাধিক আর্থিক সূচক বিশ্লেষণের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির টার্নওভার ও ঘোষিত মুনাফার সম্পর্ক, গ্রস প্রফিট রেশিও, সুদ ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন এবং পরিচালকদের সম্মানী।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে আমদানি করা কাঁচামালের বিপরীতে স্থানীয় বাজারে বিক্রির হিসাব এবং ভ্যাট টার্নওভার ও আয়কর রিটার্নে দেখানো টার্নওভারের তুলনা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্ক তৈরির কাজ চলছে। অর্থাৎ, একই ধরনের ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর উৎপাদন, বিক্রয়, মুনাফা ও কর প্রদানের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য থাকলে তা সহজে নজরে আসতে পারে। এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছে চারটি খাতে, সিমেন্ট, সিগারেট, খাদ্য ও পানীয় এবং এমএস পণ্য বা রড-ঢেউটিনসহ সংশ্লিষ্ট খাতে।
প্রাথমিকভাবে এসব খাতের বাজারের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানি, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত উপকরণ, উৎপাদিত পণ্যের বাজার অংশ এবং রাজস্ব প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ করছে এনবিআর।
কাঁচামাল থেকে বাজার, মিলবে পুরো হিসাব
একটি সিমেন্ট কোম্পানি কত ক্লিংকার আমদানি করেছে, সেই কাঁচামাল দিয়ে আনুমানিক কত উৎপাদন হওয়ার কথা এবং সেই তুলনায় কোম্পানিটি কত পণ্য বিক্রি করেছে; এ হিসাব মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি করতে চায় এনবিআর।
একইভাবে সিগারেট কোম্পানির কাঁচামাল ব্যবহার, উৎপাদন ও বাজারে বিক্রির তথ্য যাচাই করা হবে। খাদ্য ও পানীয় খাতে পানি, এনার্জি ড্রিংকস, কার্বনেটেড ও নন-কার্বনেটেড পানীয়ের বাজার অংশ ও রাজস্ব তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে। রড, ঢেউটিন ও প্রি-ফেব্রিকেটেড অবকাঠামো তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও কাঁচামাল থেকে বাজার পর্যন্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো কোম্পানির শুধু একটি রিটার্ন বা একটি হিসাবের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
ধরা যাক, একই ধরনের দুটি কোম্পানি প্রায় সমপরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ও রাজস্ব অন্যটির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম। আবার একটি কোম্পানি বাজারে বড় অংশীদার হলেও তার কর প্রদানের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এমন পরিস্থিতিতে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এনবিআরকে প্রশ্ন করার যৌক্তিক ভিত্তি দিতে পারে।
এভাবে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর পাশাপাশি বাজারে অসম প্রতিযোগিতা কমানোরও সুযোগ রয়েছে। কারণ, যারা নিয়ম মেনে কর ও ভ্যাট দেয়, তাদের তুলনায় ফাঁকি দিয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারলে অসৎ প্রতিষ্ঠান বাড়তি সুবিধা পায়। ফলে শুধু সরকার রাজস্ব হারায় না; সৎ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
শুধু নতুন কর নয়, পুরোনো ফাঁকিও খুঁজবে এনবিআর
এনবিআরের নতুন কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বকেয়া রাজস্ব আদায়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আদায়যোগ্য বকেয়া ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে এনবিআর জানিয়েছে।
এই বকেয়া আদায়ের জন্য পৃথক ইনকাম ট্যাক্স ডেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অখালাসকৃত ও বাজেয়াপ্ত পণ্য দ্রুত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে কাস্টমস।
বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কর অব্যাহতির সুবিধা আরও যৌক্তিক করার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে এনবিআরের তথ্য থেকে জানা গেছে।
অর্থাৎ রাজস্ব বাড়ানোর নতুন কৌশল কেবল নতুন করদাতা খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনটি উৎসকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে— এক. করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা। দুই. বিদ্যমান করদাতাদের প্রকৃত আয় ও ব্যবসার সঙ্গে কর প্রদানের সামঞ্জস্য যাচাই করা। তিন. বকেয়া কর ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব কার্যকরভাবে আদায় করা।
তিন মাস থেকে তিন বছর, এনবিআরের রোডম্যাপ
এনবিআর পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি ধাপে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে টিআইএন ডেটাবেজ পরিচ্ছন্ন ও শ্রেণিবিন্যাস, শীর্ষ বকেয়া করদাতার তালিকা তৈরি এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য পৃথক ইউনিট কার্যকর, করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে প্রচার এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে স্বয়ংক্রিয় আয়-সম্পদ প্রোফাইলিং এবং ইলেকট্রনিক অডিট নির্বাচন পরীক্ষামূলকভাবে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পূর্বে পূরণ করা বা প্রি-ফিল্ড আয়কর রিটার্ন, দেশব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
আর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ক্রস-ম্যাচিং, ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস এবং আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্সভিত্তিক আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কর কর্মকর্তার বদলে ‘সিস্টেম’ বাছাই করবে কাকে অডিট করা হবে
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি বড় পরিবর্তন হতে পারে অডিট ব্যবস্থায়। বর্তমানে কোন করদাতা বা কোম্পানির হিসাব বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে মানবিক বিবেচনা ও কর্মকর্তার ভূমিকা তুলনামূলক বেশি। নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকির বিভিন্ন সূচক ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিটের জন্য করদাতা বা কোম্পানি নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে চালু করা হবে ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও ফেসলেস অডিট।
এতে করদাতাকে বারবার কর কর্মকর্তার কাছে যেতে হবে না; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নথি ও ব্যাখ্যা জমা দিয়ে নিরীক্ষা ও কর নির্ধারণের বড় অংশ সম্পন্ন করা যাবে।
নীতিগতভাবে এটি হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে। তবে এর জন্য সিস্টেমটি স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং জবাবদিহিমূলক হওয়া জরুরি। কারণ, ভুল তথ্য বা ভুল অ্যালগরিদমের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তা নতুন ধরনের হয়রানির কারণও হতে পারে।
উচ্চ সম্পদশালীদের জন্য আলাদা নজরদারি
বাংলাদেশে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বা হাই-নেট-ওয়ার্থ ব্যক্তিদের প্রকৃত সম্পদ ও কর প্রদানের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
এ কারণে এনবিআর তাদের জন্য পৃথক প্রোফাইল এবং বিশেষ ইউনিট কার্যকর করার পরিকল্পনা করেছে। এই শ্রেণির ব্যক্তিদের সম্পদ, বিনিয়োগ, ব্যাংক লেনদেন, বিদেশ ভ্রমণ, কোম্পানির মালিকানা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে কর দেওয়ার সক্ষমতার সঙ্গে প্রদত্ত করের সামঞ্জস্য যাচাই করা হবে।
তবে এখানেও বড় প্রশ্ন হলো—শুধু উচ্চ সম্পদশালী হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করলেই হবে না, সেই তথ্য কতটা নির্ভুল এবং কোন আইনি কাঠামোর আওতায় ব্যবহার করা হবে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থপাচার ঠেকাতে বিদেশেও নজরদারি
বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার ও রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে বাংলাদেশ মিশনে ‘কাস্টমস অ্যাটাশে’ পদ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছে এনবিআর।
এর কারণ, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বা মিস-ইনভয়েসিং শনাক্ত করতে শুধু বাংলাদেশের তথ্য যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে কোনও পণ্য ১০০ ডলারে আমদানি দেখানো হলেও রপ্তানিকারক দেশের তথ্য অনুযায়ী তার প্রকৃত মূল্য ৬০ বা ১৫০ ডলার হতে পারে। এই ধরনের পার্থক্য যাচাই করতে উৎস দেশ, রপ্তানিকারক, কোম্পানির পরিচয় ও প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্য প্রয়োজন।
কাস্টমস অ্যাটাশে ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিদেশি উৎস থেকে এসব তথ্য সংগ্রহের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ, কঠিন লক্ষ্য
এনবিআরের পরিকল্পনার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলো দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। বর্তমানে এই হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদে এটি আরও ২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করলেই কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত বাড়বে না।
এর জন্য প্রয়োজন— সঠিক ও মানসম্মত তথ্যভাণ্ডার; বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময়; ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন, বিআরটিএ, শেয়ারবাজার, কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মান ও সামঞ্জস্য; তথ্য সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সুস্পষ্ট নীতি; দক্ষ প্রযুক্তিগত জনবল; দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত আইন প্রয়োগ।
এনবিআর গত অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বড় ব্যবধান পূরণে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে কর আদায় বাড়ানো যে কঠিন, তা সরকারের নতুন পরিকল্পনাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লক্ষ্য পূরণ করা অবাস্তব নয়, অসম্ভবও নয়। এনবিআরের কর্মকর্তারা যদি আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে তাহলেই সম্ভব।
তিনি বলেন, নিরীহ করদাতাদের পেছনে অডিটের নামে সময় নষ্ট না করে যারা এখনো করের আওতায় আসেনি তাদের আনার চেষ্টা করতে হবে। আর বড় বড় করদাতাদের দিকে নজর দিতে হবে। যারা সম্পদশালী, দেশের প্রভাবশালী, তাদের ফাইল ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হবে। সাধারণ করদাতাদের অডিটে ফেলে হয়রানি না করে যারা ফাঁকি দেন তাদের পেছনে সময় দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, করের আওতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন করদাতাদের দিকে বেশি অ্যাটেনশন দিতে হবে।
তাহলে আসল জাদুর চাবিকাঠি কী?
এনবিআরের নতুন পরিকল্পনাগুলো আলাদাভাবে দেখলে এগুলো অনেকগুলো প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বলে মনে হতে পারে—ডেটা ওয়্যারহাউস, অটোমেটেড প্রোফাইলিং, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট, বাজার অংশ যাচাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং। কিন্তু এগুলোর সবকটির কেন্দ্রবিন্দু একটিই; তথ্যের সমন্বয় ও সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্য ব্যবহার।
করদাতা যে তথ্য নিজে ঘোষণা করেন, তার বাইরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য ছড়িয়ে রয়েছে। ব্যাংকের কাছে লেনদেনের তথ্য, ভূমি অফিসের কাছে জমির তথ্য, বিআরটিএর কাছে গাড়ির তথ্য, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তথ্য, কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য, কাস্টমসের কাছে আমদানি-রপ্তানির তথ্য, ভ্যাটের কাছে বিক্রয়ের তথ্য এবং বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যয়ের তথ্য রয়েছে।
এতদিন এসব তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে থাকায় করদাতার সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চিত্র এক জায়গায় পাওয়া কঠিন ছিল। নতুন পরিকল্পনা সফল হলে এনবিআর মূলত এই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একটি করদাতা প্রোফাইলে এনে প্রশ্ন করবে; ঘোষিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে মিল আছে কি?
ব্যক্তির ক্ষেত্রে উত্তর না মিললে উচ্চ-ঝুঁকির সংকেত আসবে। কোম্পানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল, উৎপাদন, বাজার অংশ, বিক্রয় ও রাজস্বের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য ধরা পড়বে। সেখানেই নতুন কৌশলের সম্ভাব্য শক্তি।
তবে প্রযুক্তি একা কোনও জাদুর কাঠি নয়। ভুল তথ্যের ওপর তৈরি ডেটা সিস্টেম ভুল ফল দেবে, দুর্বল সাইবার নিরাপত্তা করদাতার তথ্য ঝুঁকিতে ফেলবে, আর কর্মকর্তার ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকলে ডিজিটাল ব্যবস্থাও হয়রানির নতুন মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ফলে এনবিআরের সামনে এখন আসল পরীক্ষা পরিকল্পনা ঘোষণার নয়, বাস্তবায়নের।
তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন যদি সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভরভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে কর আদায়ে এনবিআরের নতুন কৌশলের সবচেয়ে বড় ‘জাদুর চাবিকাঠি’ হবে তথ্যের সমন্বয়। আর সেই তথ্যের সঙ্গে করদাতার ঘোষণার গরমিল ধরতে পারলেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনের চিরচেনা চিত্র।
এসএন/পিডিকে