ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস গাজায় তাদের অস্ত্রসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছে—এমন ঘোষণার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ জয়োচ্ছ্বসিত মেজাজে রয়েছেন।
তবে বৃহস্পতিবারের এই নিরস্ত্রকরণ চুক্তির শর্তাবলীতে এটিও উল্লেখ রয়েছে যে, ইসরায়েলি বাহিনীকে এই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। নিরস্ত্রীকরণের এসব শর্ত ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও দেশটির গণমাধ্যম বেশ শীতল ও অনাগ্রহী প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছে। খবর আলজাজিরার।
ইসরায়েল সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেছেন, গাজা উপত্যকায় কূটনৈতিক অগ্রগতির খবর সত্ত্বেও ইসরায়েলের দৃষ্টিতে হামাসের প্রকৃত অস্ত্রসংবরণ না হওয়া পর্যন্ত গাজায় অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তিতে খুবই আনন্দিত।
নির্বাচনি আত্মহনন
২০০৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে চালানো হামাসের হামলার পর, অনেক ইসরায়েলি ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর মনোভাব বজায় রেখেছেন। যদিও এর পর থেকে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ চালিয়ে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং পুরো অঞ্চলটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
মে মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি উত্তরদাতা গাজায় ফিলিস্তিনিদের তাদের ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন। একই জরিপে আরও দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে থাকা ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরও তাড়িয়ে দেওয়াকে সমর্থন করেন।
এর এক মাস পরের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, জরিপভুক্ত ৬৪ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে গাজার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কেউ নির্দোষ নয়।
এমনকি সরকারি মন্ত্রীসহ অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ বলেছেন, দখলকৃত পশ্চিম তীরকে বিভক্তকারী অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোর মতোই শিগগিরই গাজাতেও বসতি স্থাপন করা হবে।
কাজেই গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ভূখণ্ডটির পুনর্গঠনের উদ্যোগের বিষয়টি অনেক ইসরায়েলির কাছেই তিক্ত বা অপ্রিয়। ফলে রাজনীতিবিদরাও খুব দ্রুতই এই নিরস্ত্রকরণ চুক্তির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেন-গভির লিখেছেন, ‘হামাসের খুনিদের হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া মানে হামাসকে পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের জন্য সংগঠিত হতে সুযোগ দেওয়া। গাজায় হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হবে এবং দেশত্যাগে উৎসাহিত করতে হবে। ইসরায়েলকেই জিততে হবে।’
এখানে ‘দেশত্যাগে উৎসাহিত করা’ পরিভাষাটিকে সর্বজনীনভাবে জাতিগত নিধন বা এথনিক ক্লিনজিংয়ের রূপক হিসেবে গণ্য করা হয়।
মধ্যপন্থি বলে পরিচিত রাজনীতিবিদ, যেমন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন চিফ অব স্টাফ এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটও সমানভাবে ‘সংশয়’ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির ‘ধ্বংস অর্জন’ না করে যেকোনো চুক্তি করা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার সামিল।
আইজেনকোট লিখেছেন, ‘৭ অক্টোবরের সকাল থেকে প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেছে এবং হামাস ৬ অক্টোবরের সন্ধ্যার মতোই তাদের শক্তি পুনরুজ্জীবিত করেছে।’
শান্তির রাজনীতি
নেতানিয়াহু এখনো কোনো মন্তব্য করেননি, তবে মার্কিন-ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী ও পরামর্শক ডালিয়া শিন্ডলিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর জন্য ‘বাজিটি’ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নেতানিয়াহু অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ড এড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগটি নির্ভর করছে অক্টোবর মাসের নির্বাচনে তার জয়ের ওপর। কিন্তু বর্তমানে বহু জরিপে বিরোধীরা এগিয়ে রয়েছে এবং তারা সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসনও পেতে পারে।
ডালিয়া শিন্ডলিন বলেন, নেতানিয়াহুর চিন্তাভাবনায় ৭ অক্টোবরের হামলার গণমানসিক আঘাতের কোনো ভূমিকা নেই। তার পুরো মনোযোগ রাজনীতির ওপর। তিনি প্রধানত তার বর্তমান জোট সহযোগীরা কী ভাবছেন তা নিয়েই চিন্তা করবেন।
শিন্ডলিন জানান, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি একেবারেই অসম্ভব। তিনি আরও যোগ করেন, নেতানিয়াহু তার জোট টিকিয়ে রাখতে এবং ডানপন্থি ভোটারদের কাছে টানতে যে কৌশলই নিন না কেন, তা করতে হবে মার্কিন মিত্রদের বেশি ক্ষুব্ধ না করে। কারণ মার্কিন মিত্ররা ইতিমধ্যে তার ওপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে।
ডালিয়া শিন্ডলিন বলেন, নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মার্কিনিদের চোখে এই চুক্তি বাস্তবায়নের যেকোনো সম্ভাব্য পদক্ষেপের নস্যাৎকারী হিসেবে গণ্য হতে চাইবেন না। তাই তিনি গাজার ভেতরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কিছু প্রতীকী নড়াচড়া ঘটাতে পারেন।
শিন্ডলিনের মতে, নেতানিয়াহুর একটি কৌশল হতে পারে ইসরায়েলি বাহিনীকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যে অবস্থানে থাকার কথা ছিল, সেখানে ফিরিয়ে নেওয়া। তবে সেই চুক্তির পর থেকেও ইসরায়েল ১২০০-র বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং চুক্তি উপেক্ষা করে বারবার তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করেছে।
ট্রাম্পকে শান্ত রাখা
ইসরায়েলকে নিয়ে মার্কিন প্রত্যাশা সামলানো শুধু নেতানিয়াহুর জন্যই নয়, দেশের নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল রাজনীতিকের জন্যই একটি বড় সমস্যা হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা ইতোমধ্যেই বলেছেন, ইসরায়েল এই নিরস্ত্রকরণ চুক্তি মেনে না চললে ট্রাম্প খুবই হতাশ হবেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েল স্টাডিজের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যান বলেন, নেতানিয়াহু এমনিতেই সরকার গঠনে কঠিন লড়াইয়ের মুখে আছেন, তিনি এই চুক্তিতে রাজি হলে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।
নেতানিয়াহু অতীতে গাজা সংক্রান্ত ইসরায়েলের ওপর আরোপিত শর্তাবলী পাশ কাটিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তার অতি-ডানপন্থি জোটের ঐক্য বজায় রেখেছিলেন। যদিও সেই জোটের কিছু সদস্য বারবার হুমকি দিয়েছিল যে, হামাসের পূর্ণাঙ্গ পরাজয় ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে তারা সরকার ফেলে দেবে। তিনি নতুন এই চুক্তি নিয়ে আপাতত চুপ থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তাকে কথা বলতেই হবে।
ডভ ওয়াক্সম্যান বলেন, সেটি একটি সত্যিকারের সমস্যা হতে পারে। কারণ নেতানিয়াহু যদি চুক্তির সমালোচনা করেন, তবে তিনি ট্রাম্পকে রাগান্বিত করার ঝুঁকি নেবেন। যদিও ট্রাম্প এখনো ইসরায়েলি নির্বাচনে তাকে সমর্থন করেননি, তবে নেতানিয়াহু নিশ্চয়ই আশা করছেন যে ট্রাম্প তাকে নির্বাচনকালীন সময়ে কিছু না কিছু উপহার দেবেন—তা হোক তার ক্ষমার ব্যাপারে আরও জোরালো আহ্বান কিংবা সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, অথবা দুটিই। তবে ট্রাম্পকে তার নিজের পক্ষেই রাখতে হবে।
যদিও ইসরায়েলি জনগণ এই বিষয়ে সংশয়ী হয়ে উঠেছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারের তালিকায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা এখনো শীর্ষে আছে কি না, তা সত্ত্বেও মার্কিন নিরাপত্তার ছাতাতলে থাকার প্রয়োজনীয়তা দেশের অধিকাংশ জনগণ ও রাজনৈতিক মহল স্বীকার করে। এমনকি রাজনৈতিক মহলের একাংশ নেতানিয়াহুর সমালোচনা করার হাতিয়ার হিসেবে সম্পর্কে কিছুটা ফাটল ধরার বিষয়টিকে ব্যবহার করেছে।
দ্য ইসরায়েলি ইনস্টিটিউট ফর রিজিওনাল ফরেন পলিসিজ-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা নিমরোড গোরেন বলেন, নেতানিয়াহু অতীতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজেকে অত্যন্ত দক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
এই ইসরায়েলি বিশ্লেষক আরও যোগ করেন, ‘আমি মনে করি তার সেনা প্রত্যাহারের ধারণাটি কেবল জনমতের বাইরেও বিস্তৃত। এটি তার পুরো দর্শন, আদর্শ ও বিশ্বদর্শনের পরিপন্থি—যা হলো ইসরায়েলকে তার সীমানার বাইরে এবং যেখানেই খারাপ উদ্দেশ্যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। কোনো সেনা প্রত্যাহারের আলোচনার চেয়ে বরং নির্বাচনের আগে তিনি সংঘাত আরও বাড়াতে পারেন বলেই আমি মনে করি।’