সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি পুনর্গঠনে মস্কোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে দামেস্ক। প্রায় ১৮ মাসের আলোচনার পর হওয়া এই চুক্তির আওতায় হমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটির বেসামরিক স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সামরিক স্থাপনাগুলোকে যৌথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এ সমঝোতার ঘোষণা দেয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রায় দেড় বছর ধরে চলা আলোচনা ও নিবিড় বৈঠকের ফল হিসেবে এই সমঝোতা হয়েছে।
কী থাকছে সমঝোতায়
চুক্তির আওতায় হমেইমিম বিমানবন্দর এবং তারতুস বন্দরের চতুর্থ বাণিজ্যিক জেটিসহ বেসামরিক স্থাপনাগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে সিরীয় রাষ্ট্র। এসব স্থাপনা ধীরে ধীরে সিরিয়ার বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, দুই ঘাঁটির সামরিক স্থাপনাগুলোকে ‘যৌথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ রাশিয়াকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না; বরং দেশটির সামরিক উপস্থিতির ধরন ও পরিসর বদলে যাচ্ছে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পরিবর্তন বাস্তবায়নের কাজ তিন মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আসাদ আমলের পর বড় পরিবর্তন
বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়া-রাশিয়া সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ আসাদ সরকারকে টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
হমেইমিম বিমানঘাঁটি হয়ে ওঠে সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান অভিযানের প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে তারতুস নৌঘাঁটি ছিল ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। এর মাধ্যমে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি ও নৌ সক্ষমতা বজায় রাখত।
নতুন সমঝোতার ফলে আসাদ আমলে রাশিয়া যেভাবে এসব স্থাপনা পরিচালনা করত, সেই ব্যবস্থা আর থাকছে না। তবে মস্কোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার একটি সীমিত কাঠামো বজায় থাকছে।
সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর জোর
দামেস্ক এই সমঝোতাকে সিরিয়ার ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। দেশটির নতুন সরকার বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে একাধিকবার আলোচনা করেছেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি মস্কো সফরও করেছেন।
ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি সিরিয়া তার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের বাণিজ্যিক অবকাঠামোও নতুনভাবে সাজাচ্ছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তারতুসের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দর পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ৩০ বছরের একটি চুক্তি দেয় দামেস্ক। চুক্তিটির মূল্য প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ফরাসি জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান সিএমএ সিজিএমের সঙ্গে লাতাকিয়া বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তিও নতুন করে করা হয়। ৩০ বছরের ওই চুক্তিতে ২৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং একটি নতুন গভীর পানির জেটি নির্মাণের কথা রয়েছে।
ফলে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি পুনর্গঠনের পাশাপাশি সিরিয়া তার উপকূলীয় অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া
রোববার ঘোষিত সমঝোতা নিয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে চুক্তির ধরন থেকে স্পষ্ট, সিরিয়া রাশিয়াকে পুরোপুরি বিদায় না করে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাকে নতুন কাঠামোয় নিয়ে যেতে চাইছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে সিরিয়া তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করছে।
এসএন/পিডিকে