ম্যারাডোনার স্মৃতির মঞ্চে আজ মেসির পরীক্ষা

লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে ট্রফির অভাব নেই, রেকর্ডেরও শেষ নেই! বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ব্যালন ডি’অর-ফুটবলে জেতার মতো প্রায় সবকিছুই জিতেছেন তিনি। তবু ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে একটি অধ্যায় কখনও লেখা হয়নি। সেটি হলো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামা। অবশেষে সেই অপূর্ণতা ঘুচতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, সেমিফাইনালে!

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আজ রাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলবেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা। এমন এক ম্যাচে, যার পুরস্কার বিশ্বকাপের ফাইনাল।

এই অপেক্ষার গল্প শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে হোসে পেকারম্যানের অধীনে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় মেসির। কিন্তু স্বপ্নের সেই দিনটি মাত্র ৯০ সেকেন্ডেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে কনুইয়ের আঘাতের অভিযোগে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকের চেয়ে বিদায়টাই সেদিন বেশি আলোচনায় ছিল।

সেই সময় সতীর্থ হার্নান ক্রেসপো তরুণ মেসির পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘১৮ বছর বয়সী একটি ছেলে, যে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক করছে এবং যার সামনে অনেক স্বপ্ন- তাকে এভাবে শাস্তি দেওয়া উচিত হয়নি। রেফারির আরও সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার ছিল।’

সেই লাল কার্ডই পরে কেড়ে নেয় আরেকটি সুযোগ। তিন মাস পর জেনেভায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারেননি মেসি। এরপর ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে বহুবার, কিন্তু আর কখনও ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়নি। ফলে দুই দশকের বেশি সময় পর প্রথম দেখাটাই হচ্ছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে খেলেছেন নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বিশ্বকাপে খেলেছেন রেকর্ড ৩২টি ম্যাচ, করেছেন ২১ গোল। কোয়ার্টার ফাইনালের পর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষেও ছিলেন তিনি। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে এখন তার চোখ আরেকটি লক্ষ্যেই-আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর ইংল্যান্ডকে নিয়ে নিজের অনুভূতির কথাও জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক, ‘ইংল্যান্ড ছাড়া প্রায় সব দলের বিপক্ষেই আমি খেলেছি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাটা বিশেষ, কারণ তারা একটি বড় ফুটবল শক্তি। এমন একটি দলের বিপক্ষে, তাও আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলতে পারা সবসময়ই দারুণ ব্যাপার।’

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানেই ফিরে আসে ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনালের স্মৃতি। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ শুধু একটি ম্যাচের ফল বদলায়নি, ফুটবল ইতিহাসেও স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে মেসিকে ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি যদি আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লিখতে পারেন, তবে সেই তুলনা আরও গভীর হবে!

শুধু একটি ম্যাচ নয়, এই সেমিফাইনালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কয়েকটি বড় সম্ভাবনা। জয় পেলে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে। পাশাপাশি ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নও বাঁচিয়ে রাখবে। আর ব্যক্তিগতভাবে মেসিও ছুঁতে পারবেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর বিরল কীর্তি। ১৯৯৪ থেকে ২০০২ পর্যন্ত টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিলেন কাফু। আর্জেন্টিনা জিতলে মেসিও পৌঁছে যাবেন সেই অনন্য উচ্চতায়।

ফুটবল তাকে প্রায় সবকিছুই দিয়েছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সুযোগটি এত দিন অধরাই ছিল। ভাগ্যের পরিহাসে যে অধ্যায়টি শুরু হতে পারত ২০০৫ সালে, সেটিই শেষ পর্যন্ত লেখা হচ্ছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। আর সেই অধ্যায়ের শেষটা যদি ফাইনালের টিকিট দিয়ে রাঙানো যায়, তাহলে মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে যোগ হবে আরেকটি স্মরণীয় গল্প!

দ্বিতীয় সেমিফাইনাল

ইংল্যান্ডআর্জেন্টিনা

সরাসরি, রাত ১টা

বিটিভি, টি স্পোর্টস ও সময় টিভি

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *