নেইমারের অবসর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন আনচেলত্তি

অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নেইমার অধ্যায়ের সমাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করলেন সেলেসাও কোচ কার্লো আনচেলত্তি। হলুদ জার্সিতে সুপারস্টার নেইমার জুনিয়রকে যে আর কখনোই আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাঠে দেখা যাবে না, তা জানিয়ে দিয়েছেন এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড।

গত বিশ্বকাপের চরম হতাশা কাটিয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দলকে নতুন আঙ্গিকে সাজাতে এখন পুরোপুরি তারুণ্যের ওপর ভরসা করছেন আনচেলত্তি। আর সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন তিনি।

সান্তোসের এই তারকা ফরোয়ার্ড আর জাতীয় দলে ফিরছেন না—এমন ঘোষণা দিয়ে আনচেলত্তি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নেইমারের বর্ণাঢ্য ও চড়াই-উতরাইয়ে ভরা আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের চূড়ান্ত ইতি ঘটে গেছে। বিগত আসরগুলোর ব্যর্থতা ভুলে দলকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে এখন তরুণদের নিয়ে এগোতে চান এই অভিজ্ঞ কোচ।

সিএনএন এস্পোর্তেসকে দেওয়া এক খোলামেলা দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি জানান, জাতীয় দলে আর না ফেরার এই সিদ্ধান্তটি অন্য কারও নয়, খোদ নেইমারের নিজেরই। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিল ফুটবলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেইমার চলে যাওয়ায় দলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো বিকল্প দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন আনচেলত্তি।

ব্রাজিল কোচ বলেন, ‘নিজের অসাধারণ মানের কারণেই দলে থাকার পূর্ণ যোগ্যতা তার ছিল। তবে নেইমার নিজেই নিশ্চিত করেছে যে, সে আর জাতীয় দলে ফিরতে চায় না। একটা কথা পরিষ্কার, নেইমারের বিকল্প তৈরি করা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ সে একজন অনন্য প্রতিভাবান ও অপূরণীয় ফুটবলার।’

নেইমার যুগের অবসানের পর এখন কোচ কার্লো আনচেলত্তি এবং জাতীয় দলের পরিচালক রদ্রিগো কায়েতানোর মূল লক্ষ্য দলটিকে আমূল বদলে ফেলা। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজ শুরু করে দিয়েছেন তারা। দল পুনর্গঠনের এই পরিবর্তনটি তাদের সাম্প্রতিক স্কোয়াডেই স্পষ্ট, যেখানে অভিজ্ঞদের পাশ কাটিয়ে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে দেশের লিগের প্রতিশ্রুতিশীল ও উদীয়মান তরুণদের।

আগামী দিনের রূপরেখা তুলে ধরে তরুণ ফুটবলারদের প্রসঙ্গে আনচেলত্তি বলেন, ‘আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এখন আমাদের মূল ফোকাস ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরদের ওপর—বিশেষ করে ২০০৪, ২০০৫ ও ২০০৬ সালে জন্ম নেওয়া তরুণদের দিকে। এমনকি ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়াও অনেক দারুণ মানের খেলোয়াড় রয়েছে। বয়স ও তাদের পারফরম্যান্স বিবেচনা করে এখনই তাদের সুযোগ দেওয়ার সঠিক সময়। এটা ঠিক যে ৩৬ বা ৩৭ বছর বয়সেও কেউ কেউ দারুণ খেলে, তবে এখন আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো তরুণরা।’

গত বছরগুলোতে ব্রাজিলের ফুটবলের বড় একটি সমালোচনা ছিল দলের অতিমাত্রায় ব্যক্তিনির্ভরতা—যেখানে মাঠে ম্যাচের ফল আনতে কেবল নেইমারের জাদুর ওপর নির্ভর করে থাকত দল। আনচেলত্তি সেই বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে মানানসই একটি শক্তিশালী দলীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। যেখানে কোনো বিশেষ ব্যক্তির চেয়ে দলগত ঐক্য ও সামর্থ্যই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি।

অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে আসন্ন প্রীতি ম্যাচগুলোর মাধ্যমেই শুরু হতে যাচ্ছে আনচেলত্তির এই নতুন কৌশলের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা যাচাই করতে এই ম্যাচগুলোতে বেশ কয়েকজন নতুন মুখের অভিষেক হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

নিজের নতুন এই দর্শন স্পষ্ট করে আনচেলত্তি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আধুনিক ফুটবলে কেবল ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। আসল কথা হলো দলগত ফুটবল। দলে বড় মাপের প্রতিভা থাকলে অবশ্যই জেতার পথ সহজ হয়, কিন্তু বর্তমানের আধুনিক ফুটবল দলগত বোঝাপড়ার অভাব কোনোভাবেই ক্ষমা করে না। আমরা কোনো একক তারকার ওপর অন্ধের মতো নির্ভর করতে চাই না, বরং আগামীর ফুটবলের জন্য একটি সুসংহত ও শক্তিশালী দল তৈরি করতেই আমাদের পুরো মনোযোগ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *