পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বহু ভবন ধসে পড়েছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্যমতে, অন্তত ১৬৪ জন নিহত এবং প্রায় এক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বহু এলাকায় সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক হাসপাতালেও চিকিৎসাসেবা সীমিত হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ঘোষণা
ভূমিকম্পের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়াকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং অন্যান্য মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই দুর্যোগের সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিষেধাজ্ঞা ত্রাণ কার্যক্রমে কতটা বাধা?
মানবিক সহায়তা কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভেনেজুয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের আরোপিত অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ত্রাণ কার্যক্রম নানা জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
ফিনল্যান্ডের হামলগ ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ও মানবিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ সারাহ শিফলিং বলেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য অর্থ স্থানান্তর, স্থানীয় সরবরাহকারীদের অর্থ প্রদান, জরুরি সরঞ্জাম আমদানি এবং বিদেশি কর্মী মোতায়েন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
তার ভাষায়, মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গভীর অর্থনৈতিক সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, ভূমিকম্প এমন এক সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। খাদ্য, ওষুধ ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি আগে থেকেই বড় সমস্যা ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় বাজারে জরুরি পণ্যের সরবরাহ সীমিত থাকায় বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে সেই সহায়তাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হলেও উদ্বেগ কাটেনি
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক লেনদেনের অনুমতি দেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আংশিক শিথিলতা মানবিক সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
তাদের মতে, ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা, আন্তর্জাতিক পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে বিলম্ব ঘটাতে পারে।
মানবিক সহায়তায় রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা
মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়ায় নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মানবিক সহায়তা যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার না হয়। আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালা অনুযায়ী, ত্রাণ কার্যক্রম হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং কেবল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত।
পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ
উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর ভেনেজুয়াকে বিশাল পুনর্গঠন কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে হবে। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বাস্তবসম্মত নীতি এবং কার্যকর মানবিক সমন্বয় ছাড়া ভেনেজুয়েলার জন্য এই সংকট কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন হবে।